• বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তা, বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভার রোগের আশঙ্কা

কেমিক্যালে পাকানো ফলে সয়লাব বাজার,অতি মুনাফার ফাঁদে বিষাক্ত ফল

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট  থেকে :: 

দেশজুড়ে বাজারে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফলের ছড়াছড়ি। অধিক মুনাফার আশায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফল ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন রাসায়নিক হরমোন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারজাত করছে। এসব ফল কিনে যেমন প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা, তেমনি নীরবে বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে কেমিক্যালযুক্ত ফল বিক্রি হলেও কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সূত্রে জানা গেছে, কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল মানবদেহে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কার্বাইডে পাকানো ফল হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে এবং পুরুষদের প্রজনন সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস ও স্নায়বিক দুর্বলতার ঝুঁকিও বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার থেকে ফল কেনার পর খাওয়ার আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিত। পাশাপাশি বেকিং সোডা মিশ্রিত পানি বা হালকা গরম পানিতে ধুয়ে নিলে ফলের গায়ে থাকা কিছু রাসায়নিকের প্রভাব কমানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপরিপক্ব ফল দ্রুত পাকাতে অনেক ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং ইথোফেনজাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ক্যালসিয়াম কার্বাইড মূলত শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক পদার্থ। এটি আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস উৎপন্ন করে, যা ফল দ্রুত পাকাতে সহায়তা করে। তবে এ প্রক্রিয়ায় পাকানো ফল মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. কামাল হোসেন মুফতি বলেন,, কার্বাইডে পাকানো ফল খাওয়ার ফলে পেটের ভেতর প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। এতে তীব্র পেটব্যথা, বমি, বমিভাব, ডায়রিয়া ও পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া অ্যাসিটিলিন গ্যাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, মানসিক বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এমনকি খিঁচুনির মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, নিম্নমানের কার্বাইডে আর্সেনিক ও ফসফরাসজাতীয় বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি থাকতে পারে। এসব উপাদান দীর্ঘদিন মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যানসার, লিভার ও কিডনির জটিল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত কেমিক্যালযুক্ত ফল খেলে এসব অঙ্গের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “অসাধু কেমিক্যাল সিন্ডিকেট ফলের মৌসুম শুরুর এক থেকে দুই মাস আগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে কাঁচা ফলকে পাকা দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু ভোক্তাদের সচেতন হলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোকেও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় এই প্রতারণা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।”

অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক সহকারী পরিচালক জানান, খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিষয়টি বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থার আওতাভুক্ত। তবে বাজার তদারকির অংশ হিসেবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ফলের বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category