• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ন

বাবা: এক অপ্রকাশিত ভালোবাসার নাম

ইউনাইটেড ডেস্ক / ৬৫ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

‘বাবা’ মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে ত্যাগ, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও আত্মনিবেদনের এক বিশাল জগৎ। বাবা নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি নীরবে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হয়। বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ দিনের। বাবা যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় সন্তান বেড়ে ওঠে নিরাপদে। তিনি সন্তানের সাহস, ভরসা ও নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান তিনি।

বাবার প্রতিটি ঘামবিন্দু, প্রতিটি নির্ঘুম রাত আর প্রতিটি ত্যাগ সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের গল্প বলে। অনেক সময় বাবারা তাঁদের ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করেন না। কিন্তু সন্তানের সামান্য সাফল্যেও তাঁদের চোখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়, সেটিই ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর প্রকাশ। বাবার কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে সীমাহীন স্নেহ, মমতা ও দায়িত্ববোধ।

বাবা দিবসের ইতিহাস
আধুনিক বাবা দিবসের ধারণা আসার বহু আগে থেকেই ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ১৯ মার্চ ‘সেন্ট জোসেফ ডে’ পালন করতেন। যীশু খ্রিস্টের পালক পিতা সেন্ট জোসেফের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই দিনটি উদযাপিত হতো। পরবর্তীতে ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মোনোনগাহ কয়লাখনিতে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে শত শত শ্রমিক নিহত হন, যাঁদের অনেকেই ছিলেন বাবা। এই ঘটনার পর ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই নিহত বাবাদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

আধুনিক বাবা দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯১০ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরে সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারী তাঁর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রথমবারের মতো ‘ফাদার্স ডে’ উদযাপনের উদ্যোগ নেন। ধীরে ধীরে দিবসটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে সরকারি তিতুমীর কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রকাশ করেছেন নিজেদের বাবাদের নিয়ে তাদের অনুভূতি। স্মরণ করেছেন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটিকে। তাঁদের কথায় ফুটে উঠেছে বাবার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

সাহস ও নিরাপত্তার প্রতীক
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তাবাসসুম আক্তার রাতমি বলেন, ‘বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয় বরং তিনি একজন সন্তানের সাহস, নিরাপত্তা ও জীবনের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা। একজন বাবা নীরবে নিজের স্বপ্ন, সুখ ও চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাঁর কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও অগণিত ত্যাগ।

বিশ্ব বাবা দিবস আমাদের সেই মহান মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ দিন। বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না। তাই বাবা দিবস শুধু উদযাপনের নয়, বরং বাবার প্রতি সম্মান, যত্ন ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষকসংহীন ত্যাগ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তপ্ত রোদে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ করে তিনি শুধু আমাদের পরিবারকে আগলে রাখছেন না, দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। নিজের সব কষ্ট আড়াল করে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। আমার কাছে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন তিনি সততা, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতীক।

অপ্রকাশিত ভালোবাসার নাম 
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আশিক বাবু বলেন, ‘আমার কাছে বাবা মানে এক অপ্রকাশিত ভালোবাসা। বাবা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি পৃথিবী। কখনো উদার আকাশ, কখনো শীতল বটবৃক্ষ। দেখতে দেখতে জীবনের ২২টি বছর পার হয়ে গেল, অথচ কখনো সামনাসামনি বলা হয়নি—বাবা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। বাবারাও হয়তো মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করতে সংকোচবোধ করেন। কিন্তু সন্তানের সামান্য সাফল্যে তাঁদের চোখে যে আনন্দাশ্রু দেখা যায়, তা হাজারো ভালোবাসি শব্দের চেয়েও মূল্যবান। বাবার ঘামে ভেজা শার্টের গন্ধই আমার কাছে জান্নাতের ঘ্রাণ। বাবার পায়ে মাথা রেখে শুধু বলতে ইচ্ছে করে—আব্বা, তুমি ছাড়া আমি কিছুই না। তোমার ত্যাগ ও কষ্ট কখনো বৃথা যেতে দেব না।’

অদৃশ্য মহানায়ক
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সোহেল মিয়া বলেন, বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে কলম থমকে যায়। কারণ বাবার ভালোবাসা কোনো গল্প বা কবিতা নয়; এটি এক অনন্ত ত্যাগের নাম, এক নীরব সংগ্রামের মহাকাব্য।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয় হলেন বাবা। যিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যান। তাঁর এই লড়াইয়ের কোনো সংবাদ শিরোনাম হয় না, ত্যাগের কোনো পুরস্কারও থাকে না। তবুও তিনি নিরলসভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যান। শৈশবে আমরা বুঝিনি বাবার ক্লান্ত মুখের আড়ালে কত শত দুশ্চিন্তা লুকিয়ে থাকত। আজ বড় হয়ে বুঝতে পারি, আমাদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে বাবার অসংখ্য ত্যাগ ও পরিশ্রম জড়িয়ে আছে।

বিশ্ব বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। কারণ বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, সবচেয়ে বড় আশ্রয় এবং ভালোবাসার আরেক নাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category