প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাকাসে অন্তর্বর্তী সরকার বসানোর সাত মাস পার হয়েছে। এই সমযে দেশটির উৎপাদিত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেকই এখন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হচ্ছে। তবে উৎপাদিত তেলের আয় ব্যয় নিয়ে স্পষ্ট কোন হিসেব খোদ ভেনেজুয়েলা সরকারের কাছে নেই। এ নিয়ে দেশটির মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধোয়াশা তৈরী হয়েছে বলে এক মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) হিউস্টনে আয়োজিত একটি জ্বালানি শিল্প সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ আন্ডার সেক্রেটারি কাইল হাউসটভেইট জানান, ভেনেজুয়েলার দৈনিক প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের মধ্যে ৫ লাখ ব্যারেলেরও বেশি যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার এই বিশেষ ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী করে গড়ে তোলা মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোতেই এই তেল পাঠানো হচ্ছে।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়- যার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মোট মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে কয়েক দশকের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহে দেশটির অবদান নেমে এসেছিল মাত্র ১ শতাংশ। ২০১৫ সালের শেষে ভেনেজুয়েলা দৈনিক মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যেত দৈনিক ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেলের মতো।
ভেনেজুয়েলার তেল মূলত ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত প্রকৃতির। মার্কিন মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের পরিশোধনাগারগুলো এই ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি, ফলে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি পুনরায় শুরু হওয়ায় এই কারখানাগুলো সরাসরি লাভবান হচ্ছে।
হাউসটভেইট জানান, ওয়াশিংটনও ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে। দেশটি থেকে ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মেশানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক ১ লাখ ব্যারেলেরও বেশ ন্যাপথা পাঠাচ্ছে ভেনেজুয়েলায়।
এই বাণিজ্য কাঠামোকে ‘এক চমৎকার জ্বালানি অংশীদারিত্ব’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “এই লেনদেনের ফলে দুই পক্ষই প্রকৃতপক্ষে লাভবান হচ্ছে।”
একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা জানান, তাদের দেশ তেল উৎপাদন আরো বাড়াতে আগ্রহী।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পিডিভিএসএ’-এর সহ-সভাপতি জোভানি মার্টিনেজ জানান, চলতি আগস্ট মাসের শেষের মধ্যেই দেশের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ১২ দশমিক ৪৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাবে এবং চলতি বছর রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। তিনি আরো জানান, এ বছর দেশে জ্বালানি উৎপাদন ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্টিনেজ বলেন, “আমরা জ্বালানি খাতে সংস্কার আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি এবং এখন উন্নয়নের ক্ষেত্রে এর সুফল প্রত্যাশা করছি।” তিনি উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলার নিজস্ব শোধনাগারগুলোকে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন এবং ভারী তেলের জন্য প্রয়োজনীয় মিশ্রক দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
তেলের আয় নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন থেকে ভেনেজুয়েলার শাসনভার পরিচালনা ও সেখানকার তেল সম্পদ ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই দেশটিতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই পরিবর্তন সূচিত হয়। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যূতের ঠিক পরপরই ট্রাম্প বলেছিলেন, “ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে তেলের অর্থ সঠিক ব্যবহারে আমি নিজেই এই অর্থের তদারকি করব।”
পরবর্তীতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ এমন একটি অ্যাকাউন্টে জমা হবে যার ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তিনি জানান, কারাকাস প্রতি মাসে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে বাজেটের চাহিদা পাঠাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আগেই নির্ধারণ করে দেবে যে সেই অর্থ কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।”
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরেই ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। ২৭ জুলাই ট্রাম্প সেই প্রতিবেদনের জবাবে বলেন, প্রকৃত অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ এই তথ্যের চেয়েও বেশি। তবে এই অর্জিত অর্থ কোথায় বা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সে বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রায় নীরব থেকেছে।
গত এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালায়ের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের দপ্তর ভেনেজুয়েলার জন্য আনুমানিক ৩০০ কোটি ডলার বরাদ্দের অনুমোদন দিয়েছে।
অপশাসন ও নতুন স্বৈরাচারের ঝুঁকি
তবে স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’ গত জুনে উদ্বেগ প্রকাশ জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসেবে দাবি করলেও ‘তারা ঠিক কত পরিমাণ তেল বিক্রি করেছে, কত রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়েছে, কিংবা সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে- তার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব দেয়নি।” ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভেনেজুয়েলার সোনা ও অন্যান্য খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্বচ্ছতা বজায় রয়েছে।
সংস্থাটি আরো সতর্ক করে যে, কারাকাসে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আলোচনায় ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত না করার যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে, তা চরম উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলি রদ্রিগেজের নেতৃত্ব পরিচালিত হচ্ছে।
যদিও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোসহ ভেনেজুয়েলার প্রধান বিরোধী দলগুলো মে মাসে এক নতুন রূপরেখায় সম্মত হয়েছে, যেখানে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা ও স্বাধীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস পরিশেষে সতর্ক করে বলে, “কোনো জবাবদিহিতা বা সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক রূপরেখা না থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলায় অপর এক দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীকেই টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করছে।”
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা