প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর করের হার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা লাখো মধ্যবিত্ত পরিবার, অর্ধকোটিরও বেশি অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী ও পেনশনভোগীদের মাসিক আয় অনেকটাই কমে যাবে।
এমনিতেই বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্তরা হিমশিম খাচ্ছেন, তার ওপর এই সিদ্ধান্ত তাঁদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অর্থবিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থবিলে এই পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয় এবং সেটিকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে নতুন প্রস্তাব পাস হলে এই নিয়ম আর থাকছে না। এখন থেকে মুনাফা তোলার সময় সরাসরি ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হবে, যা অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্য পরবর্তীতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই বাড়তি করের টাকা সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
তবে সঞ্চয়পত্র ক্রেতা ও সাবেক একজন সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাস্তবে সঞ্চয়পত্রে যারা বিনিয়োগ করেন, তাঁদের একটি বড় অংশই নিয়মিত করদাতা নন। অনেকেরই টিআইএন (TIN) নেই এবং তারা আয়কর রিটার্নও জমা দেন না। ফলে কেটে নেওয়া বাড়তি কর ফেরত পাওয়ার আইনি সুযোগ থাকলেও জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ সেই সুবিধা নিতে পারবেন না।
তিনি আরও যোগ করেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর দ্বিগুণ করায় আমার মতো মধ্যবিত্তদের ওপর চাপ অনেক বাড়বে। দেশের একটা বড় অংশের মধ্যবিত্ত পরিবার এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসার চালায়। সরকারের এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল।
ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের একটি বিশাল অংশই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, গৃহিণী, বিধবা নারী ও সীমিত আয়ের মানুষ। তাঁরা প্রতি মাসের খরচ চালানোর জন্য এই মুনাফার ওপর নির্ভর করেন। কর বাড়ার কারণে স্বভাবতই তাঁদের হাতে আসা প্রকৃত টাকার পরিমাণ কমে যাবে।
হিসাবটা কেমন দাঁড়াবে?
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে বর্তমানে মুনাফার হার ১১.৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি এক লাখ টাকার বিপরীতে মাসে মুনাফা আসে প্রায় ৯৯৪ টাকা। এতদিন ৫ শতাংশ কর কাটার পর গ্রাহক হাতে পেতেন প্রায় ৯৪৫ টাকা। কিন্তু নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ১০ শতাংশ কর কাটার পর এই আয় কমে ৯০০ টাকার নিচে নেমে আসবে।
যদিও বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জমান মজুমদার দাবি করেছেন, এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন কোনো বড় পরিবর্তন করা হয়নি।
নিয়মে কী বদল আসছে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, অর্থবিল ২০২৬-এর মাধ্যমে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১৬৩ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে নেওয়া অর্থ অগ্রিম কর হিসেবে জমা থাকবে। বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের পর যদি দেখা যায় যে, কেটে নেওয়া করের পরিমাণ মূল করের চেয়ে বেশি, তবে বাড়তি টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। এজন্য করদাতাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরসহ আবেদন করতে হবে এবং যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এসব সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ অনুযায়ী বর্তমানে ১১.৭৭ শতাংশ থেকে ১১.৯৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দেওয়া হচ্ছে।