• শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

খেলাপি ঋণ কমাতে আসছে নতুন আইন

বাণিজ্য ডেস্ক / ২১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন (ডামা) অনুযায়ী, বেসরকারি বিশেষায়িত কোম্পানি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে আদায়, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের সুযোগ পাবে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে অচল ঋণ সরিয়ে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রকাশ করে সবার মতামত আহ্বান করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) মডেল সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের কাঠামো গড়ে তুলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো পেশাদার ও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন করা, পুনঃতফসিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।

ব্যাংকারদের মতে, আদালতে দীর্ঘসূত্রতা, সম্পদ বিক্রির জটিলতা এবং দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ বছরের পর বছর আটকে রয়েছে। ফলে ব্যাংকের তারল্য, মুনাফা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই ইউনিট লাইসেন্স প্রদান, তদারকি, নীতিমালা প্রণয়ন, জরিমানা আরোপ এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা পাবে।

লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে উঠবে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি, যারা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে তা আদায় বা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেবে। পাশাপাশি থাকবে লোন সার্ভিসার বা ঋণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, যারা ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতা, পুনঃতফসিল, সম্পদ মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে মূলত অর্থঋণ আদালতের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন আইনে ব্যাংক চাইলে খেলাপি ঋণ বিশেষায়িত কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে। এরপর ওই কোম্পানি ঋণ পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর কিংবা জামানত বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে পারবে।

খসড়া আইনে শুধু জামানত বিক্রির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বরং সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সচল রেখে ঋণ আদায়ের সুযোগও রাখা হয়েছে। এর আওতায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পুনর্গঠন, নতুন অংশীদার আনা, ব্যবসার অংশবিশেষ বিক্রি বা ইজারা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে।

এ ছাড়া, একাধিক খেলাপি ঋণ একত্র করে তার বিপরীতে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে তহবিল গঠনের সুযোগ থাকলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।

আইনের খসড়া অনুযায়ী, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে এবং নির্ধারিত মূলধন থাকতে হবে। পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন অথবা সম্পদ পুনরুদ্ধারে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্য স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনস্থ ইউনিট যেকোনো সময় এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব, নথি ও তথ্য যাচাই করতে পারবে। আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও থাকবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে খেলাপি ঋণের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, ঋণ কেনাবেচার আইনি জটিলতা দূর করা এবং জামানতের অধিকার সহজে হস্তান্তরের সুস্পষ্ট বিধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা কঠিন হবে।”

অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অতীতেও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু আইনি দুর্বলতার কারণে সেগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। নতুন আইনে সেই সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, আইনের খসড়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে গঠনমূলক মতামত প্রত্যাশা করছে সরকার। মতামতের ভিত্তিতে আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাজার গড়ে উঠবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, নতুন ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি এবং বিদেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category