ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহ ফুটে উঠেছে জার্মানির এক পরিসংখ্যানে। এ বছর কেবল অতিরিক্ত গরমজনিত কারণেই দেশটিতে অন্তত ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৮ সালের আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে।
২১ আগস্ট (শুক্রবার) প্রকাশিত সরকারি তথ্যে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
জার্মানির জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি- প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি ঘটেছিল জুন মাসের শেষের মাত্র এক সপ্তাহে, যখন দেশটির তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছিল।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে পুরো ইউরোপজুড়ে এবছর নজিরবিহীন গরমের গ্রীষ্মকাল চলছে, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবারের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত স্পেনের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি তাপজনিত মৃত্যু রেকর্ড করেছে। একই সময়ে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ৭ হাজার ৩০০টিরও বেশি তাপজনিত মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
জার্মানির পাবলিক হেলথ অথোরিটির তথ্য অনুযায়ী, তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন প্রবীণরা। বিশেষ করে ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর হার কম হলেও মূলত অতিরিক্ত গরম ও পূর্বের বিভিন্ন জটিল রোগের যৌথ প্রভাবেই বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎসের রক্ষণশীল দলের জুনিয়র জোটসঙ্গী মধ্য-বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্রেটস (এসপিডি)- এর মন্ত্রীরা জানান, জার্মানির মূল আইন বা সংবিধানে ‘জলবায়ু অভিযোজন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ’- এর বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা বার্লিনের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
এসপিডির পরিবেশমন্ত্রী কার্স্টেন স্নাইডার বলেন, জলবায়ু সংকট এখন একটি ‘দৃশ্যমান বাস্তবতায়’ পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলোকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তার মন্ত্রণালয় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রীরা নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত আইন ও নির্মাণ বিধিতে সংশোধন আনা এবং তীব্র তাপমাত্রায় কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষায় নতুন শ্রম আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানান।
হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রমের বেহাল দশা
এসপিডির সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাখ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এই দাবি সমর্থন করে বলেন, পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্থানীয় পৌরসভাগুলোর আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
রাইনিশে পোস্ট নামক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “কার্যকর তাপসুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অনেক পৌরসভাই দেনায় জর্জরিত এবং তারা নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিতে সমর্থ নয়।”
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ‘জার্মান অ্যাসোসিয়েশন অব টাউনস অ্যান্ড মিউনিসিপ্যালিটিজ’ উল্লেখ করে যে, প্রায়শই এয়ার-কন্ডিশনিং ব্যবস্থা না থাকা হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোকে এই তীব্র তাপমাত্রা সহ্য করার উপযোগী করে তুলতে শত শত কোটি ইউরোর প্রয়োজন।
সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট রালফ স্পিগলার রাইনিশে পোস্টকে জানান, “কেবল রোগীদের জন্যই নয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষাতেও হাসপাতালগুলোতে এয়ার কন্ডিশনিং অত্যন্ত জরুরি। আমাদের হিসেবে এ খাতে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।”
“জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা এবং সুবিধাগুলোকে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশেষ করে অবসরকালীন আবাসস্থল ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোর অবস্থার দিকে নজর দেওয়া একান্ত দরকার।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী লাউটারবাখ জানান, এ বছর তাপজনিত মোট মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা পরিসংখ্যানে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়েও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, “রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট বেশ সতর্ক ও রক্ষণশীল পদ্ধতি অনুসরণ করে হিসাব করে। এর অর্থ হলো, তাপজনিত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত কিছুটা কম করে দেখানো হচ্ছে।”
তথ্যসূত্র: ফ্রান্স ২৪