যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে একটি নতুন শান্তিচুক্তির চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত হয়েছে এবং সেই খসড়ার বিষয়ে দুই দেশই সম্মত হয়েছে বলে দাবি করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। একই সঙ্গে এ বিষয়ে গুজব ও অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। খবর দিয়েছে রয়টার্স ও জিও নিউজ।
শুক্রবার (১২ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি ভেস্তে দিতে অপতথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি অবগত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সব ধরনের বিভ্রান্তি ও গুঞ্জন উপেক্ষা করে তারা নিশ্চিত করতে পারছেন যে শান্তিচুক্তির একটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এতে সম্মতি জানিয়েছে।
শেহবাজ শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন চুক্তির পরবর্তী ধাপগুলো চূড়ান্ত করতে পাকিস্তান দুই পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তার দাবি, শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এর আগে কখনও এতটা কাছাকাছি আসেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। শুক্রবার এক্সে দেওয়া পৃথক বার্তায় তিনি বলেন, ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় সমঝোতার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
তিনি আরও বলেন, চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার আগে গণমাধ্যমের উচিত এর বিষয়বস্তু নিয়ে অযথা জল্পনা-কল্পনা না করা। যথাসময়ে দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে।
যা থাকতে পারে প্রস্তাবিত চুক্তিতে
নতুন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, খসড়ায় থাকা সম্ভাব্য কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।
খসড়া অনুযায়ী, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করে এবং সেখানে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করে, তাহলে তেহরানের জব্দ বা ফ্রোজেন অর্থের কয়েক বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেবে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোও ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা ৬০ দিন সময় পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়ায় ইরানকে যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি থেকেও ওয়াশিংটন সরে আসতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে এবং তা ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। কারণ, এই সমৃদ্ধির মাত্রা ৯০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে তা দিয়ে সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব।
তবে প্রস্তাবিত নতুন চুক্তির খসড়ায় ইউরেনিয়াম নিয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানকে তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ করলেই কেবল ফ্রোজেন অর্থ ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুবিধা মিলবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুরো চুক্তিটি হবে সম্পূর্ণ পারফরম্যান্সভিত্তিক। অর্থাৎ ইরান যদি হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ না তুলে নেয়, ইউরেনিয়াম ধ্বংস না করে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করে, তাহলে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা, ক্ষতিপূরণ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে না। এসব শর্ত মেনেই তেহরানকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও এক্সে দেওয়া বার্তায় বলেন, শুধু আলোচনায় অংশ নেওয়া বা চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেই ইরান নগদ অর্থ কিংবা নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পাবে— এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে, ইরানের অন্যতম দাবি ছিল লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তির বর্তমান খসড়ায় এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।