গাজীপুর প্রতিনিধি
‘বেশী না একটা শুট করাম, একটা শুটে পইরা যাবে। কাজ বন্ধ থাকবে। যতদিন পর্যন্ত ফয়সালা না হবে ততদিন পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকবে। এই জমি নিয়ে ইউএনও সাহেবের কাছে বিচারাধীন আছে।’ দখলীয় জমিতে কাজ করার সময় কাজের লোককে এভাবে প্রকাশ্যে হুমকি দেন কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুজ্জামান মন্ডল। তার হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (১ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের বলদিঘাট (লালমাটিয়া) গ্রামে বিরোধপূর্ণ জমিতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, কাওরাইদ ইউনিয়নের সোনাব গ্রামের মৃত উছেম উদ্দিনের ছেলে আবুল কালাম সাভার থানায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত। শুক্রবার কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে তিনি জমিতে কাজ করতে এসেছেন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে গেলে বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান মন্ডল তার শ্রমিককে হুমকি দিয়ে এসব কথা বলেন।
এ সময় আবুল কালামকে বলতে শোনা যায়, ‘কামরুল এভাবে বলো না শ্রমিককে, আমাকে বলো। তুমি তারে (শ্রমিককে) না করছো কেন? সে তো কাজের লোক। আমারে না করো। তুমি আমাকে বলো, তারে বলছো কেন?
একজন পুলিশ কর্মকর্তার সামনে প্রকাশ্যে বিএনপি নেতার এমন হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
জমির মালিক আবুল কালাম জানান, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচটি দলিলে জামাল উদ্দিন সরকার এবং রিয়াজ উদ্দিন সরকারের কাছ থেকে ৮২৫ দাগের ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ জমি কিনেছি। মোট জমি ১০ বিঘা। আরও প্রায় ৯ বিঘার বেশি রয়ে গেছে। আমাকে চৌহদ্দি দিয়ে জমির দখল বুঝিয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা। আমার জমিতে কাজ করতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান মন্ডল এসে বাধা দেয়। ওই জমিতে জোতদারের (জমির মালিকদের) দখলীয় জমি এখনো রয়ে গেছে। তাদের বাবার দেওয়া জমির শ্রেণী হলো চালা জমি, আর আমার জমির শ্রেণী হলো বাগান জমি।
তিনি আরও বলেন, বিক্রেতাদের বাবা আফতাব উদ্দিন সরকার ১৯৭২ সালে ৭০ শতাংশ জমি স্কুলে দান করে গেছেন। স্কুলের দলিলে কোনো চৌহদ্দি নেই। জোতদারের জমি যদি না থাকে এবং সর্বশেষ দলিল যদি আমার হয় তাহলে আমি স্কুলকে জমি দিয়ে দেব। কামরুজ্জামান মন্ডল স্কুলের কিছুই না। তিনি বিএনপি করেন, এটাই তার ক্ষমতা। কামরুজ্জামান বলে, তার বাবা ইসহাক আলী মন্ডল ১৯৭০ সালে ৭০ শতাংশ জমি দিয়ে গেছেন। কিন্তু স্কুলে এক শতাংশ জমিও নেই। তার ক্ষমতার কারণে জমি দেওয়া লাগে না।
এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুজ্জামান মন্ডল।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি বলদীঘাট জে এম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ছিলাম। যার নামে স্কুলের নামকরণ তিনি ১৯৭২ সালে ৭০ শতাংশ জমি দান করেছেন। পরে আমার বাবাও দিয়েছেন ৭০ শতাংশ। ৫-৭ বছর আগে আবুল কালাম এখানে জায়গা কিনেছে। তাকে বলা হয়েছে, এখানে স্কুলের জায়গা আছে। স্কুলের জায়গা এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। সে কথা না শুনে জোরপূর্বকভাবে জমিতে স্থাপনা করা শুরু করেছে।
‘গত এপ্রিলের ২৯ তারিখ জমির বিরোধ নিয়ে ইউএনওর কাছে শুনানি হওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ ইউএনও বদলি হয়ে যাওয়ায় ওইদিন শুনানি হয়নি এবং নতুন ইউএনও চলতি মাসের ২০ তারিখ উভয় পক্ষকে উপস্থিত থেকে শুনানিতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে কাজ শুরু করলে আমি শ্রমিককে বলেছি, শুট করবো। এই কথাটাকে অপব্যাখ্যা করে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছে।’
কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আতাব উদ্দিন আতা জানান, ‘আবুল কালাম এ সম্পর্কে আমাকে জানিয়েছে এবং ভিডিওটা দেখেছি। শুট করার বিষয় তিনি বলেন, একজন শিক্ষিত ও ভদ্র ছেলে এরকম বলার কথা না। বিগত দিনে তার এরকম ইতিহাস পাইনি। এটা আমি কনফার্ম হওয়ার পরে বলতে পারব।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আবুল কালাম এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার কাছে এসেছিলেন। তাদেরকে আগামী ২০ তারিখ সকল কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত থাকার জন্য বলেছি।’
ইউনি/শাহোরা/