ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ঘিরে সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মকাণ্ডে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন, পরে সেগুলো ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলা, অনুমোদন ছাড়াই ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট চালুর ঘটনায় ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পাশাপাশি ডাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সংস্কারকাজ শেষে ডাকসুর সংগ্রহশালা পুনরায় চালু করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়। ছবিগুলোর মধ্যে ছিল ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদন এবং জিন্নাহর একটি একক ছবি।
ছবি প্রদর্শনের পর থেকেই এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক প্রবীণ শিক্ষার্থী। তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে দাবি করেন।
নিজের দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রহশালায় যাওয়ার পর একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি প্রথমে জিন্নাহর একটি একক ছবি ভাঙচুর করেন। পরে ফ্রেম থেকে ছবিটি বের করে ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর বাকি দুটি ছবি মেঝেতে আছড়ে ভেঙে একইভাবে ছিঁড়ে ফেলেন।
এ সময় আবু তৈয়ব হাবিলদার বলেন, ‘যা মন চায়, তা করতে দেওয়া হবে না। কেন এই খলনায়কের ছবি ডাকসুতে থাকবে? আমরা ’৭১ ও ভাষা সংগ্রাম ভুলিনি।’
ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সাদিক কায়েম, তুমি কি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাও?’
ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল পালিত হয়েছিল। ওই সময় অনেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দাবি, ভাষার বিরোধিতাকারী জিন্নাহর ছবি ডাকসুতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হতে পারে না।
প্রসঙ্গত, এর আগে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আবু তৈয়ব হাবিলদার সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে তিনি ১০ ভোট পেয়েছিলেন।
এদিকে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে অনুমোদন ছাড়া পৃথক একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজ উদ্যোগে আলাদা কোনো মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত। বর্তমানে ওই নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও জানিয়েছে, ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া গড়ে তোলার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।