বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানকে মারধর ও হয়রানির ঘটনার পেছনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। জানা গেছে, মূলত সোনা চোরাচালান সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করেছিল পুলিশ। চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার ওসি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তবে অভিযানের সময় ভুল শনাক্তকরণের কারণে বিপাকে পড়েন খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম। সন্দেহভাজন হিসেবে ভুলবশত ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে আটক, হেনস্থা ও মারধর করায় শেষ পর্যন্ত সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ প্রশাসন। এতে পুলিশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় এ ঘটনার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানের নির্দিষ্ট তথ্য ছিল। তবে তথ্য যাচাই এবং অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদস্য যে-ই হোক না কেন, অনিয়মের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। পুলিশের ভাবমূর্তির সঙ্গে বিষয়টি জড়িত, তাই কোনো ধরনের অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না।
সূত্রের দাবি, শুক্রবার ছুটিতে ঢাকায় থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সোনা পাচারের তথ্য দেন। তিনি দাবি করেছিলেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তিনি এ তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে লালখান বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন এসআই শফিকুল ইসলাম।
কিন্তু অভিযানের সময় ওই সিএনজিতে থাকা ব্যক্তি যে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান, তা বুঝতে পারেননি এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং অভিযানে অংশ নেওয়া আরেক কনস্টেবল। নাঈম নিজের পরিচয় দিলেও তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের ফোন পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর এসআই শফিকুল ইসলামসহ দুই পুলিশ সদস্যকে শনিবার সকালে প্রত্যাহার করে সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পরে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই ঘটনায় পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত সোহেলকেও আটক করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাঈম হাসানের বড় ভাই সাব্বির হাসান জানান, শুক্রবার গভীর রাতে নাঈমকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় তার গলা চেপে ধরা হয় এবং পুলিশের কাছে থাকা পাইপ দিয়ে আঘাত করা হয়। এছাড়া সোহেল নামের ব্যক্তিও নাঈমকে মারধর করেন। পরে তিনি নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন।
স্থানীয় লোকজন তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। পরে উপস্থিত জনতা তাকে ধরে খুলশী থানায় নিয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গরিবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকার বাসিন্দা সোহেল দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে আসছেন।
এ ঘটনায় নাঈমের বড় ভাই সাব্বির হাসান খুলশী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে সোহেলকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে। অপর দুই আসামি হলেন এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী। তাদের দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সাব্বির আরও অভিযোগ করেন, খবর পেয়ে গভীর রাতে তাদের বাবা থানায় গেলে তাকে প্রায় ১৫ মিনিট বাইরে অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয় এবং শুরুতে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তিনি থানায় ঢোকার সুযোগ পান। তখন দেখা যায়, অভিযুক্ত সোহেল ওসির কক্ষে বসে আরাম করে এসির বাতাস নিচ্ছেন।