• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

ভালো ফলনেও পাট চাষীদের মাথায় হাত

বাণিজ্য ডেস্ক / ২১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে সোনালী রঙ মাখা পফসল পাট বুনেছিলো কৃষক। সেই পাটের রঙ আসপাশে আলো ছড়ালেও কৃষকের মুখের আলো ফুটাতে পারেনি। কারণ, আশার আলো ফিকে হয়েছে বাজারে এসে ‘সোনালি আঁশ’ পাটের দাম শুনে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাট নিয়ে যত দরদাম করছিলেন কৃষক, ততই হতাশা বাড়ছিলো। বাজারে যে দামে পাট বিক্রি হচ্ছিলো এতে কৃষকের খরচই উঠার কোন উপায় নেই।

পাটের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের ঘরে এবার স্বস্তি ফেরার কথা ছিল। হাটে এসে দামের এই পতনে সেই স্বস্তিই এখন বিষন্নতায় বদলে যাচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা, মৌসুমের ভরা সময়ে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাট উঠলে দাম আরো কমতে পারে। ভালো ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কাই এখন তাদের বড় দুশ্চিন্তা।

এদিকে সপ্তাহ দুই-একের ব্যবধানে পাটের বাজার নিন্মমূখী। মণপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া একই পাটের দাম নেমে এসেছে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি পাটের দাম কমেছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে ভালো ফলন পেয়েও উৎপাদন খরচ ও প্রত্যাশিত লাভ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পাটচাষিরা।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নওহাটা হাটে গিয়ে দেখা যায়, নতুন পাটের কেনাবেচা চলছে। কৃষকেরা ভ্যান ও নসিমনে করে পাট হাটে নিয়ে এসেছেন। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের চলছিল দর কষাকষি। আশানুরূপ দাম না পেলেও অনেক কৃষককে পাট বিক্রি করতে দেখা গেছে, আবার অনেকেই পাট বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে পাটের দর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে নতুন পাটের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে।

পদ্মার চর মাঝারদিয়ার কৃষক সাইফুল ইসলাম ৬৫ মণ পাট নিয়ে নওহাটা হাটে এসেছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে তিনি একই মানের ১০ মণ পাট ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলেন। সেদিন তার হাতে এসেছিল ৪০ হাজার টাকা।

এই কৃষক বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছি। একই মানের পাট ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে এবার। এক মণ পাটে ৮০০ থেকে হাজার টাকা কমে গেছে। আমরা তো এক-দুইশ টাকা কমার কথা মেনে নিতে পারি। কিন্তু এভাবে একসঙ্গে হাজার টাকা কমে গেলে কৃষক যাবে কোথায়? পাটের পেছনে এতদিন খেটে যদি এই দাম পাই, তাহলে কষ্টটাই শুধু থেকে যায়।”

পবা উপজেলার দারুশা এলাকার কৃষক বাবু ১৪৯ কেজি পাট নিয়ে হাটে এসেছিলেন। ব্যবসায়ীরা মণপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ টাকা দাম বলায় তিনি পাট বিক্রি না করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। তার ভাষ্য, “এর আগে ৪ হাজার টাকা দরে ১২ মণ পাট বিক্রি করেছি। আজ ৪ মণ ১৫ কেজি পাট এনেছিলাম। আমি ৪ হাজার টাকা চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যবসায়ীরা ৩ হাজার ৪০০ টাকা বলছে। প্রায় এক হাজার টাকা কম। এত কম দামে বিক্রি করে লাভ কী? বাড়িতে আরো ২২ মণ পাট আছে। দাম না বাড়লে এখন আর বিক্রি করব না।”

নওহাটার মুসকান ট্রেডার্সের পাট ব্যবসায়ী মিলন আলী জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে পাটের সরবরাহ কম ছিল। তখন সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট কিনেছেন। এখন নতুন পাট বাজারে ওঠায় দাম কমেছে। বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে পাট কিনছেন। গত মাসে বেশি দামে কেনা পাট এখনো আছে। দাম না বাড়লে ব্যবসায়ীদেরও লোকসান হবে।

নওহাটা পাট হাটের ইজারাদার অমল দাস বলেন, “প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত হাটে পাটের বেচাকেনা হয়। প্রতি হাটে গড়ে প্রায় ২ হাজার মণ পাট বিক্রি হয়। দুই সপ্তাহ আগে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় নেমেছে।”

পাটের দর পতনের বিষয়ে পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার বলেন, “পাট উন্মুক্ত বাজারে কেনাবেচা হয়, ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে একেক হাটে পাটের দাম কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক। সরকার পাটের দর নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে, তবে বর্তমানে সরকারিভাবে পাটের দাম নির্ধারণ করা হয় না।”

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। এক বছরে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। আগাম জাতের পাটে কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছেন। নতুন পাট একসঙ্গে বেশি পরিমাণে বাজারে উঠলে সরবরাহ বেড়ে দাম কিছুটা কমতে পারে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category