• মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪০ অপরাহ্ন

চোর-ডাকাতের তাণ্ডবে দিশেহারা মেঘনার চরের গরু-মহিষ মালিকরা

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি / ১৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর দুর্গম চরে প্রতি রাতেই ঘটছে গরু-মহিষ চুরিসহ ডাকাতির ঘটনা। চোরের দল লক্ষ্মীপুরের গরু-মহিষ নিয়ে যায় ভোলার চরাঞ্চলে, আর ভোলা থেকে আনা হয় লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলে। এভাবেই চলছে চুরির ‘সিন্ডিকেট’। এতে বাধা দিতে গেলেই চোরের হামলার শিকার হচ্ছে মহিষ পালনকারীরা। আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মালিকপক্ষ। এসব ঘটনায় চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টানাপোড়ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর মেঘা ও রামমোহন চর দখল করে রেখেছে কয়েকটি পরিবার। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও তাদের পরিবর্তন নেই। একই পরিবারের লোকজন বিভিন্ন দলের রাজনীতি করে আসছেন। এতে সিন্ডিকেটও ভাঙছে না, ওই সিন্ডিকেটের বলয়ে প্রতিনিয়ত চরে ঘটছে চুরি-ডাকাতি। শুক্রবার (১ আগস্ট) রাতে মেঘনার চরে ভোলা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৫টি মহিষ চোরের দল নিয়ে আসে। পরে মহিষগুলো সৈনিক লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিনের মেঘার চরের বাথানের পাশে রেখে যায়। এ খবরটি পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মহিষগুলো গিয়াস তার মহিষের পালের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছে।

এদিকে বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে একই চরের কয়েকটি মহিষের বাথানে চোরের দল হামলার ঘটনা ঘটায়। এতে শাহজাহান, জুয়েল, জহির, নবী, নিজাম, কাদির ও রুবেল নামে কয়েকজন আহত হন। তারা লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। পরে তাদের উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার সময় মহিষসহ নগদ টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চোরের দল।

অন্যদিকে মেঘনার চরে লক্ষ্মীপুরের পাশাপাশি ভোলা ও বরিশালের অংশও রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার অবস্থান নিয়ে টানাপোড়ন দেখিয়ে আসছেন। লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় কোস্ট গার্ড কার্যালয় থাকলেও খবর পেয়েও তারা কোনো অভিযানে যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, ‘কোস্টগার্ডকে জানালে তারা বলে ভোলায় তাদের মূল কার্যালয়, সেখান থেকে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত তারা অভিযানে যাবে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন বাথান মালিক জানান, প্রতি রাতেই কারও না কারও বাথানে চোর হানা দেয়। লাখ লাখ টাকা মূল্যের গরু-মহিষ চুরি করে বাথান মালিকদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে চোরের দল। এর সঙ্গে ভোলার বাসিন্দা রাসেল খাঁ, মিন্টু খাঁ, মামুন ও আরিফ আকন্দ এবং লক্ষ্মীপুরে শফি মাঝি, গিয়াস উদ্দিন, সালাহ উদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন ও আবুল বাশাররা জড়িত রয়েছে। এর আগে ছৈয়াল গ্রুপ, সরকার গ্রুপ ও আলমগীর গ্রুপ ছিল। এখনো নামে-বেনামে তাদের গ্রুপ সক্রিয়। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের অবস্থান ও কাজের পরিধি নিয়ে টানাপোড়েন দেখান। চোর ধরলেও বিপদে থাকতে হয়। পরে দল বেঁধে এসে বাথানে থাকা লোকজনের ওপর হামলা করে। সম্প্রতি কয়েকটি বাথানে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সম্প্রতি চররমনী মোহন ইউনিয়নের বাসিন্দা তোফায়েল আহম্মদের মহিষের বাথান থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৫টি মহিষ চুরি হয়। গত এক মাস আগে মেঘার চরের মতিন বেপারির ৬টি মহিষ চুরি হয়। সেগুলোর দামও প্রায় ১০ টাকা। এছাড়া একই চর থেকে কৃষক শাহীনের একটি ও মজিব উল্যার একটি মহিষ চুরি হয়। ওই চর থেকে মহিষের পাশাপাশি গরু চুরিও এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়ন সৈনিক লীগের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমাদের মহিষের বাতান রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন আগে আমাদের মহিষ চুরি হয়েছে। আমরা কোনো চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

চররমনী মোহন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, গত রাতে ৫টি চোরাই মহিষ সালাহ উদ্দিনের ঘরের পাশে কে বা কারা রেখে গেছে শুনেছি। পরে ওই মহিষগুলো সালাহ উদ্দিনরা তাদের মহিষের পালের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিয়ে থাকলে, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।

অভিযোগ রয়েছে, চররমনী মোহান ইউনিয়ন কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাইসহ চোরাই গরু-মহিষ ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সাদ্দাম হোসেনকে কল দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত রাসেল খাঁ সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। চুরি বা হামলার ঘটনায় আমি অথবা আমার সহযোগীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

গরু-মহিষ চুরির ঘটনায় মোবাইলে বক্তব্য জানতে চাইলে নিজের নাম বলতে রাজি হননি লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট কোস্টগার্ড কার্যালয়ের কন্টিজেন্ট কমান্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে তিনি জানান, গরু-মহিষ চুরির ঘটনা তারা জানা নেই। ঘটনাটি নজরে আসেনি। নজরে আসলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, মহিষ চুরির ঘটনায় কেউ যদি লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। গত সপ্তাহেও এক চোরকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া জমির বিরোধেও একজন আরেকজনের গরু-মহিষ নিয়ে যায়। এর পরও ঘটনাগুলো নিয়ে ভোলা ও বরিশাল পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।

ভোলা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহিদুল্লাহ কাওছার সাংবাদিকদের বলেন, চরে ভোলার অংশে হামলার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category