যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আবারও হামলা চালিয়েছে ইরান। এর আগে সপ্তাহ জুড়ে তেহরানের সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা হামলা চালিয়েছে। এতে যুদ্ধবিরোতি ভেঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
উভয় পক্ষই সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। অন্যদিকে ইরান বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে, কারণ তাঁর রিপাবলিকান পার্টি নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান সংঘাতের মাত্রা কতদূর বাড়ানো যায়, তা যেন পরীক্ষা করে দেখছে। এতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় তারা নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং নৌ-সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, “মার্কিন বাহিনী যুদ্ধবিমান, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামরিক সম্পদ ব্যবহার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ সতর্ক, যুদ্ধপ্রস্তুত ও প্রাণঘাতী সক্ষমতা বজায় রেখেছে।”
ইরানের গণমাধ্যম শনিবার জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক শহরে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) পাম্পে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, হামলার কারণে জাস্কের কয়েকটি গ্রামের পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করতে তারা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে, একটি জাহাজ অচল করেছে এবং আরেকটিতে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের নিয়ম ভঙ্গকারী চারটি জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যৌথ অভিযানে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের গণমাধ্যম, আইআরজিসির বরাত দিয়ে জানায়, প্রণালির দক্ষিণে মাইন পাতা একটি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ দাবি মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইয়েমেন উপকূলের কাছে সশস্ত্র ব্যক্তিরা আরেকটি জাহাজ দখল করেছে। এতে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরজিসির বরাত দিয়ে জানায়, “যতদিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন চলবে, ততদিন এই অঞ্চল থেকে রাসায়নিক সার তো দূরের কথা, এক ফোঁটা তেল বা গ্যাসও রপ্তানি করা সম্ভব হবে না।”
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাত আরও বাড়ানো বা ইরানের কোনো ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার সতর্কবার্তা দেন।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালির ইরানি অংশের উপকূলীয় হরমোজগান প্রদেশে শত্রুপক্ষের হামলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি দুটি সেতু ও একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া সিরিক, আহভাজ, ইয়াজদ, জাস্ক ও খোররমাবাদ শহরেও শুক্রবার (১৭ জুলাই) গভীর রাত বা শনিবার (১৮ জুলাই) ভোরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বা হামলা হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (১৭ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী বান্দার খামিরে সেতুতে হামলায় সাতজন নিহত হন। সেখানে একটি রেলস্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী প্রদেশের ইরানশাহর শহরের একটি বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোর ওপর বিস্তৃত বিমান হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি ইরানের উপকূল বা দ্বীপাঞ্চলে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, দক্ষিণ ইরানে হামলার উদ্দেশ্য আংশিকভাবে ট্রাম্পের জন্য বিভিন্ন সামরিক বিকল্প খোলা রাখা।
ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে তারা বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি উত্তর ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো অন্তত দুটি এলাকায় প্রাথমিক সতর্কবার্তা জারি করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর জানায়নি। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান সৌদি আরবের কিছু জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছিল।
কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় দেশটির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আগুন লাগে এবং বহু বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানি ড্রোন হামলার জবাব দিচ্ছে।
আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে মার্কিন ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলা চালিয়েছে এবং বাহরাইনের প্রধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ধ্বংস করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা (আইআরএনএ) জানিয়েছে, ইরানি নৌবাহিনী উত্তর ভারত মহাসাগরে একটি শত্রু মার্কিন জাহাজের দিকে উপকূল থেকে সমুদ্রে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওই মার্কিন জাহাজে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং সেটি ইরানের নৌবাহিনীর পাল্লার বাইরে সরে যেতে বাধ্য হয়।
তথ্য সূত্র: রয়টার্স।