• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক নীলকুঠি

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট: / ২৪ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
মোরেলগঞ্জে ইংরেজ নীলকুঠি। ছবি ইউনাইটেড নিউজ

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘মোরেলদের নীলকুঠি’ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘদিন অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই স্থাপনাটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৮৪৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি মিসেস মোরেল তাঁর দুই ছেলে রবার্ট মোরেল ও হেনরি মোরেলের নামে এ অঞ্চলের পত্তনি গ্রহণ করেন। পানগুছি ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা আবাদ করে তারা বসতি স্থাপন এবং নীলচাষ শুরু করেন। বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক এনে গড়ে তোলা হয় বিশাল আবাসস্থল ‘কুঠিবাড়ি’।

কুঠিবাড়ি কমপ্লেক্সে ছিল আস্তাবল, পিলখানা, নাচঘর, গুদামঘর, কাছারিবাড়ি, লাঠিয়ালদের জন্য পৃথক আবাসন এবং নির্যাতন কক্ষ। সুন্দরবনের বাঘসহ হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে চারপাশে নির্মাণ করা হয়েছিল সুউচ্চ প্রাচীর।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন এই ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও কয়েক বছর আগ পর্যন্ত সেখানে সরকারি কার্যক্রম চলেছে। বর্তমানে কুঠিবাড়িটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

সময়ের পরিক্রমায় ভবনের পুরোনো দরজা, জানালা, গ্রিল, সিন্দুক, সিঁড়িসহ বহু মূল্যবান স্থাপত্য উপাদান চুরি বা বেহাত হয়ে গেছে। একই অবস্থা স্মৃতিস্তম্ভেরও। ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন।

কৃষক নেতা রহিমুল্লাহর বিদ্রোহের সাক্ষী

মোরেলগঞ্জের ইতিহাসে কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক নেতা রহিমুল্লাহর বীরত্বগাথা। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিরোধযোদ্ধা।

জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, কলকাতায় লেখাপড়া ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসে রহিমুল্লাহ তাঁর ভাইদের নিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমি আবাদ করেন। রবার্ট মোরেল তাঁর কাছে খাজনা দাবি করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে পুনরায় পিয়াদা পাঠানো হলে রহিমুল্লাহ প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে একটি কাঠের বাক্সে ছেঁড়া জুতা পাঠিয়ে দেন।

এরপর কূটকৌশলে মোরেল পক্ষ স্থানীয় এক সহযোগীকে পত্তনি প্রদান করে এবং ১৮৬১ সালের ২১ নভেম্বর শতাধিক লাঠিয়াল নিয়ে রহিমুল্লাহর বাড়িতে হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিরোধে মোরেল বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হন। হেনরি মোরেল ও তাদের ম্যানেজার হেইলি রহিমুল্লাহর হাতে আটক হলেও অনুতাপ প্রকাশ করায় তিনি তাদের মুক্তি দেন। তবে তিন দিন পর, ২৫ নভেম্বর রাতে আরও বড় অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী নিয়ে পুনরায় হামলা চালানো হয়। দুই স্ত্রীকে পাশে নিয়ে সারারাত যুদ্ধ করেন রহিমুল্লাহ। ভোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন।

ইংরেজ শাসক মোরেল পরিবারের আবাস্থল, কুঠিবাড়ি। ছবি ইউনাইটেড নিউজ

 

বঙ্কিমচন্দ্রের তদন্ত

রহিমুল্লাহ হত্যার ঘটনা তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নজরে আসে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের উদ্যোগ নেন। মামলার আসামিদের কলকাতায় নিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। হেনরি মোরেল বোম্বে থেকে এবং দুর্গাচরণ বৃন্দাবন থেকে গ্রেপ্তার হন। রবার্ট মোরেল অসুস্থ অবস্থায় বরিশালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ১৮৬৮ সালের ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন।

স্মৃতিস্তম্ভও হারাচ্ছে অস্তিত্ব

রহিমুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর মোরেল পরিবারের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পায়। পরবর্তীতে তাদের অনুসারীরা রবার্ট মোরেলের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। সেখানে সাদা পাথরে তাঁর মৃত্যু ও নির্মাতাদের নাম খোদাই করা রয়েছে। তবে দীর্ঘ অবহেলায় স্মৃতিস্তম্ভটিরও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও চুরি হয়ে গেছে।

সংরক্ষণের দাবি

ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ইতিহাস গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা।  বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটি সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন,, “কুঠিবাড়ি শুধু একটি ভবন নয়, এটি মোরেলগঞ্জের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন অবহেলায় এটি ধ্বংসের পথে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এনে দ্রুত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।” কুঠিবাড়ির জমিতে একটি শিশু পার্ক ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে স্থানীয়দের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, “কুঠিবাড়ি সংরক্ষণের বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এনে দ্রুত সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে কৃষ্ণচূড়া গাছ রোপণ এবং বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও চিন্তাভাবনা রয়েছে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category