রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে সফলভাবে প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গণমাধ্যমকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে অনুসৃত বিস্তৃত কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন করে কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকারে থাকার সময় রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসনের ইতিহাস আমাদের রয়েছে।’ নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা আবারও অপরিহার্য হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গার বড় একটি ঢল প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে আসা প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল।’
এরপর ১৯৯২ সালে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতের এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সম্পৃক্ততা থাকলে প্রত্যাবাসনে সাফল্য অর্জন সম্ভব।
২০১৭ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময়ও বেগম খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ভূমিকা পালন করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ওই সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়া সীমান্তের কাছে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং তাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানানো প্রথম সারির জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের একজন ছিলেন।
শামা ওবায়েদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘তাদের আসতে দিন, দেশে প্রবেশ করতে দিন’।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর এবং বিশেষ করে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে এবং শিবিরগুলোতে তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারেরও বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে সংকট ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসছে। এতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চাপ বাড়ছে বলে তিনি জানান।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া কাজ করেনি। এটি ব্যর্থ হয়েছে।’
আগের সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সমঝোতা করলেও শেষ পর্যন্ত বড় পরিসরে কোনো সংগঠিত প্রত্যাবাসন হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, এ কারণে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, জাতিসংঘ এখন এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবে।’