• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৬ অপরাহ্ন

সুন্দরবনের উপকূলে শামুকের বাজারে জীবিকার খোঁজ

বাগেরহাট প্রতিনিধি / ৩৬ Time View
Update : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলে চিংড়ির খাবারে শামুক, বিপন্ন জলজ জীববৈচিত্র্, কেজিপ্রতি মাত্র ৭ টাকায় শামুক ভাঙছেন শত শত দরিদ্র নারী-পুরুষ ও শিশু; নির্বিচারে আহরণে কমছে মুক্ত জলাশয়ের শামুক, বাড়ছে পরিবেশগত উদ্বেগ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শত শত দরিদ্র মানুষ। গ্রামাঞ্চলে কাজের অভাব ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকটে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে শামুক সংগ্রহ ও ভাঙার কাজে। কেজিপ্রতি মাত্র কয়েক টাকা দরে শামুক বিক্রি করেই কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে, চিংড়ির খাবার হিসেবে শামুকের চাহিদা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে বিপুল পরিমাণ শামুক এনে বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের বিল, হাওড় ও জলাভূমি থেকেও শামুক আহরণ করে আনা হচ্ছে।

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এভাবে নির্বিচারে শামুক আহরণ চলতে থাকলে একদিকে প্রাকৃতিক জলাশয়ে শামুকের সংখ্যা কমে যাবে, অন্যদিকে জলজ জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রাস্তার পাশে শামুক ভাঙার সারি

চিতলমারী উপজেলার সুড়িগাতি পালপাড়া গ্রামে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তার পাশে শত শত নারী-পুরুষকে শামুক ভাঙতে দেখা যায়। পাশের বারাশিয়া, ডুমুরিয়া, খিলিগাতি, রায়গ্রাম ও জলডাঙ্গাসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও শামুক ভাঙা এখন অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। একইভাবে ফকিরহাট, মোল্লাহাটসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায়ও দীর্ঘদিন ধরে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

শামুক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জেলা থেকে বস্তা, ঝুড়ি ও বালতিতে করে শামুক কিনে এনে গ্রামের শ্রমিকদের দিয়ে খোসা ও শামুকের নরম অংশ আলাদা করান। পরে সেই শামুকের মাংস চিংড়ি ঘেরের মালিকদের কাছে বিক্রি করা হয়।

সুড়িগাতি গ্রামের শামুক শ্রমিক রানী বিশ্বাস বলেন, বস্তা হিসেবে শামুক ভাঙেন তারা। এক বস্তা শামুকের শাঁস ছাড়ালে পাওয়া যায় মাত্র ৫০ টাকা। প্রতিদিন দুই বস্তার মতো কাজ করতে পারেন। দীর্ঘ সময় শামুক ভাঙতে গিয়ে হাতে ঘা-পাঁচড়া হয়। তবু সংসারের প্রয়োজনে কাজটি করতে হয়।

একই গ্রামের অনিতা মজুমদার জানান, বছরে প্রায় ছয় মাস শামুক ভাঙার কাজ পাওয়া যায়। গ্রামে অন্য কাজের সুযোগ কম থাকায় সংসারে বাড়তি আয়ের আশায় তিনি এ কাজ করেন। কাজ না থাকলে তাঁর স্বামীও শামুক ভাঙেন। এই সামান্য আয় দিয়েই সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়।

চিংড়ির খাবারেই বাড়ছে শামুকের চাহিদা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরে শামুকের নরম অংশ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে শামুকের চাহিদা তৈরি হয়েছে বড় একটি বাজারে।

চিতলমারীর চিংড়ি চাষি আতাউর রহমান জানান, তাঁর পরিবারের কয়েকটি ঘেরে চিংড়ির খাবার হিসেবে শামুকের মাংস ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী আনন্দ মণ্ডল বিভিন্ন স্থান থেকে শামুক কিনে এনে শ্রমিকদের দিয়ে তা ভাঙিয়ে ঘের মালিকদের কাছে সরবরাহ করেন।

ব্যবসায়ী আনন্দ মণ্ডলের ভাষায়, ব্যাপারিদের কাছ থেকে বালতি, ঝুড়ি ও বস্তা হিসেবে শামুক কেনা হয়। পরে গ্রামের মানুষকে টাকা দিয়ে শামুক ভাঙানো হয়। খোসা ও মাংস আলাদা করে মাংসটি চিংড়ি ঘেরে সরবরাহ করা হয়।

ফকিরহাটের ফলতিতা গ্রামের চিংড়ি চাষি আলাউদ্দিন টিপু বলেন, চিংড়ি ঘেরে পোনা ছাড়ার প্রায় দুই মাস পর থেকে শামুক খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। তখন শামুকের চাহিদা বাড়ে। তবে আগের তুলনায় মুক্ত জলাশয় ও বিলগুলোতে এখন শামুক কম পাওয়া যাচ্ছে।

শামুক কমছে, বাড়ছে উদ্বেগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুই দশক আগেও বিভিন্ন বিল, জলাশয় ও খালে প্রচুর শামুক পাওয়া যেত। এখন অনেক এলাকায় আগের মতো শামুক দেখা যায় না। চিংড়ি চাষের খাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার এবং নির্বিচারে আহরণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিতলমারীর ডুমুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ রানা বলেন, শামুক আহরণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা সচেতনতা কার্যক্রম নেই। ফলে চিংড়ির খাদ্য হিসেবে শামুকের একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে।

শামুকের খোসাও ফেলনা নয়। শাঁস বের করার পর বিপুল পরিমাণ খোসা জমিয়ে রাখা হয়। এসব খোসা মাছ ও পোলট্রি ফিড তৈরির পাশাপাশি পানের সঙ্গে ব্যবহৃত চুন তৈরিতেও কাজে লাগে। ফলে শামুকের প্রতিটি অংশ ঘিরেই তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক চাহিদা।

‘প্রকৃতির ফিল্টার’ শামুক

বাগেরহাটে শামুক ব্যবসা নিয়ে কেয়ার বাংলাদেশের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাণিজ্যিকভাবে শামুক আহরণের সূচনাস্থলগুলোর একটি বাগেরহাট। পরে চাহিদা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার বিল ও জলাভূমি থেকেও শামুক সংগ্রহ শুরু হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বিপুলসংখ্যক শামুকের প্রজাতি রয়েছে; এর একটি অংশ মিঠাপানির। বাংলাদেশেও নদী, বিল, হাওড় ও জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক পাওয়া যায়। এসব জলজ প্রাণী স্থানীয় পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাগেরহাট পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসাদুর রহমান বলেন, শামুক জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানিকে প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধনের ক্ষেত্রেও শামুকের ভূমিকা রয়েছে। মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় বিভিন্ন মাছের খাদ্য হিসেবেও শামুক ব্যবহৃত হয়। তাই নির্বিচারে শামুক আহরণ চলতে থাকলে দেশীয় মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক (ইনচার্জ) এ এস মনিরুজ্জামান খান বলেন, কৃষিজমি ও জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই শামুক জন্মায়। একসময় দক্ষিণাঞ্চলের বিলগুলোতে প্রচুর শামুক পাওয়া গেলেও এখন এর সংখ্যা কমে এসেছে। গত দুই দশকে চিংড়ির খাদ্য হিসেবে শামুকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, শামুক জলজ প্রতিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতিরিক্ত হারে শামুক তুলে নেওয়া হলে এর প্রভাব শুধু শামুকের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশীয় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব পড়তে পারে। হাওড় ও বিল অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ শামুক সংগ্রহ করে দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসার প্রবণতাও বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

আইনের আওতায় আনার প্রশ্ন

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা অঞ্চলের সদ্য বিদায়ী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহিদুল কবির বলেন, গোল শামুক বা আপেল শামুক নামে পরিচিত প্রজাতি আহরণে বিশেষ বিধিনিষেধ না থাকলেও শামুক বন্যপ্রাণীর আওতাভুক্ত। যে প্রক্রিয়ায় শামুক আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাত করা হচ্ছে, তা আইনগতভাবে প্রশ্নের মুখে।

তিনি বলেন, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। শামুক কমে গেলে এর ওপর নির্ভরশীল পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপরও প্রভাব পড়বে। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের উদ্বেগ রয়েছে এবং এ বিষয়ে নীতিমালা ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

জীবিকা নাকি জীববৈচিত্র্য—সমাধান কোথায়?

শামুক ভাঙা শ্রমিকদের কাছে এটি পরিবেশের কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; সংসার চালানোর বাস্তব সংগ্রাম। গ্রামে কাজের সুযোগ কম, আয় অনিশ্চিত—এমন পরিস্থিতিতে সামান্য মজুরির বিনিময়েও শামুক ভাঙার কাজ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একদিকে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন, অন্যদিকে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শামুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করার আগে এর প্রজাতি, প্রজনন মৌসুম, আহরণের পরিমাণ, প্রাকৃতিক জলাশয়ের ওপর প্রভাব এবং চিংড়ি চাষে এর বিকল্প খাদ্য নিয়ে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আহরণযোগ্য পরিমাণ নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে আহরণ বন্ধ, জলাশয়ভিত্তিক নজরদারি এবং ব্যবসায়িক পরিবহনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে।

কারণ, আজ যে শামুক কয়েক টাকা কেজিতে দরিদ্র পরিবারের হাতে সামান্য আয় তুলে দিচ্ছে, সেটিই আবার মুক্ত জলাশয়ের মাছ, পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবিকার তাগিদে নির্বিচারে আহরণ চলতে থাকলে একসময় শামুকের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পুরো জলজ প্রতিবেশব্যবস্থাই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category