সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজের পরিশ্রম, সাহস ও ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাশরুম চাষে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের সিদ্ধিপাশা গ্রামের নিপা রানী দাস।
তবে তার এই সাফল্যের গল্প একদিনে তৈরি হয়নি। জীবিকার তাগিদে একসময় মাগুরা ড্রিম মাশরুম সেন্টারে চাকরি করতেন নিপা। সেখানে কাজ করার সময়ই মাশরুম চাষের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৫ সালে চাকরির পাশাপাশি খুব অল্প পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে মাশরুম উৎপাদন শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। পরে ২০২২ সালে বাবার আর্থিক সহযোগিতায় সিদ্ধিপাশায় নিজস্ব ল্যাব স্থাপনের পাশাপাশি দুটি কালচার হাউজ তৈরি করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার মাশরুম চাষে নতুনভাবে পথচলা। বর্তমানে নিপার দুটি শেডে নিয়মিত মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে। এসব শেডে ওয়েস্টার, ঋষি ও মিল্কি মাশরুম চাষ করা হচ্ছে।
মাশরুম চাষের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিপা জানান, প্রথমে ধানের খড় সংগ্রহ করে বড় পলিথিনের মধ্যে রেখে সিদ্ধ করা হয়। এরপর পানি ঝরিয়ে খড় প্রস্তুত করে তাতে মাশরুমের বীজ দেওয়া হয়। বীজ দেওয়ার প্রায় ২৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যেই পলিথিনের ব্যাগে মাশরুমের অঙ্কুর বের হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই অঙ্কুর বড় হয়ে ধবধবে সাদা মাশরুমে পরিণত হয়। পরিপক্ব হওয়ার পর মাশরুম সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা হয়। বর্তমানে তার খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ কেজি মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে। এসব মাশরুম বিক্রি করে মাসে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। মাশরুম চাষের পাশাপাশি নিপা মাদার কালচার ও মাশরুমের বীজ উৎপাদন এবং বিক্রিও করেন। তার পুরো বাড়িটিই এখন যেন মাশরুম উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি ছোট খামারে পরিণত হয়েছে। শুধু নিজের আয়-রোজগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি নিপা; মাশরুম চাষে আগ্রহী অন্যদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন তিনি। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে মাশরুম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার কারণেই নিপা আজ অভয়নগরের একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। বর্তমানে তার উপার্জনের ওপরই পরিবারের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত নিপার রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ করে মায়ের কাছ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান। তার সঙ্গে বর্তমানে আরও দুজন নারী সহযোগী কাজ করছেন।
নিপা রানী বলেন, ‘মাশরুম নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করাই আমার স্বপ্ন। আমি চাই, আমার মতো আরও নারীরা মাশরুম চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হোক এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারুক।’
অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন বলেন, নিপা রানীর সাফল্য এলাকার বেকার নারী ও যুবকদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি দৃষ্টান্ত। স্বল্প খরচে মাশরুম চাষ করে আয় করার পাশাপাশি এটি মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিপাকে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তার ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য ঋণ গ্রহণেও সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তাকে আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।