লক্ষ্মীপুরে ১৮ কিলোমিটার মহাসড়ক খানাখন্দ আর বালু-কাদায় অচল হয়ে পড়েছে। সড়কটি সচল রাখতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অথচ মেঘনা নদীর দুটি ফেরিঘাট দিয়ে এই সড়কটি দেশের চারটি বিভাগের অন্তত ২১ জেলার সহজ যোগাযোগের মাধ্যম।
লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়কের এমন বেহাল অবস্থায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন চালক, সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। যাত্রীদের ভাষ্য, এ সড়কে চললে গোসল আর ব্যথার ওষুধ আবশ্যক হয়ে পড়ে।
গত জানুয়ারিতে সড়কটির লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার অংশে চারলেনের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী অংশের পুরোনো সড়কটি সচল হলেও লক্ষ্মীপুর অংশের ১৮ কিলোমিটারই লক্কড়ঝক্কড় অবস্থায় আছে।
এদিকে বৃষ্টি হলেই সড়কের জমে থাকা বালু কাদায় পরিণত হয়। তখন সড়কটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। এ সময় যান চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। সড়কজুড়ে থাকা গর্তে গাড়ির চাকা পড়ে ঝাঁকুনিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। গাড়িগুলোও দেখলে মনে হয় যেন হেলেদুলে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। ঘটছে অহরহ দুর্ঘটনা। এ ছাড়া বালুতে শ্বাসকষ্টসহ মানবদেহে বিভিন্ন রোগ বেড়ে যাচ্ছে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত খানাখন্দ ভরাট ও অতিরিক্ত বালু অপসারণ করে সড়কটি সচল রাখতে সওজ বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা জানিয়েছেন চালক ও যাত্রীরা। তবে দ্রুত চারলেনের কাজ শেষ করে দুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সওজ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেঘনা নদীর মজুচৌধুরীরহাট লঞ্চ-ফেরিঘাট ও চাঁদপুরের হরিণাঘাট হয়ে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অন্তত ২১টি জেলার সহজ যোগাযোগের মাধ্যম লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়ক। এ রুটে চলাচলের একমাত্র সড়কই এটি। ২৯ কিলোমিটার অংশে চারলেন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৬৯ কোটি টাকা। ২০২৯ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে নতুন লেনের কাজ চলমান অবস্থায় পুরোনো সড়কটি সচল রাখার কথা থাকলেও লক্ষ্মীপুরের অংশে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন রূপ। নোয়াখালীর অংশের ১১ কিলোমিটার সচল থাকলেও লক্ষ্মীপুরের ১৮ কিলোমিটার অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে সড়কটি দিয়ে চলছে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহন। খানাখন্দ আর জমে থাকা কয়েক স্তরের বালুতে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। সড়কের আশপাশের গাছপালার সবুজ রংও এখন বালুতে ঢেকে আছে।
সওজ সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়কের ২৯ কিলোমিটার অংশের চারলেনটির প্রস্থ হবে ২০ মিটার। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরের ১৮ কিলোমিটারে ৩২৯ কোটি টাকা ও নোয়াখালীর ১১ কিলোমিটারে ২৪০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের পশ্চিম চন্দ্রগঞ্জ বাজার থেকে মান্দারী বাজার পর্যন্ত ৯ কিলোমিটারের কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্স। মান্দারী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ পেয়েছে তাহের ব্রাদার্স নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও নোয়াখালী অংশে তিনটি প্যাকেজের দুটির কাজ পেয়েছে রিলায়েবল বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে একটি প্যাকেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রুবেল হোসেন ও ট্রাকচালক জাকির হোসেন জানান, চারলেনের কাজ চলমান রয়েছে, এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। তবে পুরোনো সড়কটি অচল হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে লক্কড়ঝক্কড় অবস্থাতেও সড়কটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। পুরো ১৮ কিলোমিটার সড়কজুড়েই ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত আর কয়েক স্তর বালু জমে আছে। বৃষ্টি হলেই কাদা-বালুতে পিচ্ছিল হয়ে ওঠা সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়, তখন ভয় নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। গাড়িও বিকল হচ্ছে।
মোটরসাইকেল আরোহী জুনায়েদ আহমেদ ও ফয়সাল মাহমুদসহ কয়েকজন জানান, সড়কে কয়েক স্তরের বালু জমে আছে। বৃষ্টি হলে কর্দমাক্ত হয়ে পুরো রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। তখন মোটরসাইকেল চালানো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর বালু শুকালেও আরেক বিপত্তি ঘটে। বালু নাকে-মুখে ঢোকে, পুরো শরীর বালুতে একাকার হয়ে যায়। এতে শ্বাসকষ্টসহ কাশি বেড়ে যায়, অ্যালার্জিও দেখা দিচ্ছে।
এ সড়কের যাত্রী ইমরান হোসেন ও আরিফ হোসেন জানান, সড়কে এখন আর মোটরসাইকেলে যাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করতে হয়। তবে গাড়ির চাকা যখন গর্তে পড়ে, পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশেও পড়তে দেখা গেছে।
ধুলাবালুতে মানবদেহের সমস্যা নিয়ে সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অরুপ পাল বলেন, ধুলাবালুর কারণে মানুষের শ্বাসযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়ে। অ্যালার্জিজাতীয় রোগও বেড়ে যায়। তবে ধুলাবালু থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে সবাইকে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, চারলেনের কাজ চলমান রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে একটা লেয়ার দিয়ে দেবো, তাতে দুর্ভোগ কমবে। মূল রাস্তার যেখানে বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে, তা সংস্কার করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টি ও ভারী যানবাহনের কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। অন্যদিকে কাদা ও বালুর বিষয়ে কিছু করার নেই। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ লাঘব করতে চাই।