বিদগ্ধ গীতিকবি শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী ও ভিন্নধারার গীতিকার তরুণ মুন্সী। শব্দের গাঁথুনির সঙ্গে সুরের মাধুর্যে এই দুই গীতিকবির গান এদেশের সংগীত পিপাসুদের ব্যাপক সমাদর অর্জন করেছে।
নান্দনিক উপস্থাপনায় গান দিয়ে মানবিক সমাজ গঠনের জাগরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন এই দুই গীতিকবি। গান দিয়ে সমাজকেও বদলে দিতে চেয়েছেন তারা।
বিনোদনের পাশাপাশি গানকে আত্মশুদ্ধির অস্ত্র হিসেবেও মনে করেন তারা। নিজেদের আড্ডায় সেসবই তুলে ধরেছেন গীতিকার শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী ও তরুণ মুন্সী।
গীতিকবি সংঘ এর আয়োজনে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৫০৫ নাম্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন।
এটি ছিলো নিয়মিত আয়োজনের দ্বিতীয় আড্ডা। আড্ডার প্রথম পর্বে নিজের গীতিকার জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরেন শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী।
গীতিকার ও সাংবাদিক নীহার আহমেদের সঞ্চালনায় শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী বলেন, আমি গীতিকারদের চেয়ে একটু ভিন্ন। তারা গান নিয়ে চর্চা করেন। তার গানকে জীবনের পরিসমাপ্তি হিসেবে চিন্তা করেন। কিন্তু আমি গানকে ব্যবহার করছি আত্ম জাগরণের জন্য। সময়ের দায়বদ্ধতা পূরণ করতে না পারলে কেউ কখনো শিল্পী হতে পারে না। জীবনের প্রতি বাঁকে বাঁকে আমি মানবিক সংগ্রামকেই বিবেচনার রাখি।
খুব ছোট বেলা থেকেই গীতিকার হতে চেয়েছি। রেডিও টেলিভিশনে গান পাঠাতাম। আর প্রতি সপ্তাহেই পোস্ট অফিসে যেতে হতো। আমার ডাক আসেনি। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যোগ দিলাম আ স ম আবদুর রবের সাথে। পরবর্তীতে রেডিওর লোকজন আমাকে চিনে। তখন তারা জিজ্ঞাস করলো আপনার জন্য কি করতে পারি। তখন আমি বললাম ২০ বছর আগে গান পাঠালাম তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য। পরবর্তীতে তারা আমাকে রেডিওতে তালিকাভুক্ত করলো। সেটা ৮৯ সালের ঘটনা। যেদিন আমার প্রথম গান রেকর্ড হওয়ার কথা সেদিন আমার মা মারা যায়। এটা আমার জীবনের সারাজীবনের কান্না। যেদিন বিটিভিতে গান প্রচার হলো সেদিন সারারাত টেনশনে ছিলাম আমার গান প্রচার হবে কিনা বা নাম প্রকাশ হবে কিনা। অবশেষে আমার স্বপ্ন পূরণ হলো। মানাম আহমেদ আমাকে প্রচুর সহযোগিতা করেছিলো। তার হাত ধরেই অডিওতে আমার প্রথম গান আসে। আমার প্রথম অ্যালবাম তার মাধ্যমেই।
গান লিখতে গিয়ে আমি নৈতিকতা চেয়েছি, স্রষ্টাকে চেয়েছি,মানবিকতা চেয়েছি। আমি আরো প্রায় ১০০টা গান লিখতে পারতাম আর দশটা হলেও জনপ্রিয়তা পেতো। কিন্তু দেশের জন্য মানুষের জন্য কিছু করতে পারতাম না। যার কারণেই মানুষের সেবার প্রয়োজনেই আমি রাজনীতিতে আসি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করেও আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। অর্জন কখনো পুরস্কার দিয়ে হয় না। মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা কখনো পুরস্কার দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়,এটি জাগরণেরও মাধ্যম। বব ডিলান গানের জন্য নোবেল পেয়েও তিন মাস যাবত নোবেল কমিটির সঙ্গে দেখা তো দূরের কথা, কথাই বলেন নি।
তিনি গানকে মানবিক জাগরণের শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। যেটা দেখা যায় না সেটাই সম্পদ। গান সম্পদ না মানবিক ও জাগরণই সম্পদ। আমি লাভবান হলাম সেটা বিষয় না, সমাজ লাভবান হলো কিনা সেটাই বিষয়। জীবনের স্বার্থকতা যদি মানবিকতা হয় তাহলেই শিল্পী বেঁচে থাকবে তার মানবিকতায়।
নিজের লেখা “চন্দ্র সূর্য যত বড়, আমার দুঃখ তার সমান”, গানটি নিয়ে ওপার বাংলার বিখ্যাত শিল্পী প্রয়াত বাপ্পী লাহিড়ীর মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, ” আমার এই গানটি শুনে বাপ্পী লাহিড়ী বলেছিলেন, বাঙালির পক্ষেই এমন দুঃখের গান লেখা সম্ভব।
“আমরা যেন প্রতিদিন মানুষ হয়ে উঠি” নিজের এমন উক্তির মধ্য দিয়েই তিনি শেষ করেন৷
শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীকে নিয়ে সংগীত পরিচালক মানাম আহমেদ বলেন, ফোক বেইজ মেটেরিয়ালগুলো তিনি গান খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। তিনি গান দিয়ে আমাদেরকে আরো সমৃদ্ধ করুক এটাই চাই।
লিটন অধিকারী রিন্টু বলেন, শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী নিঃস্বার্থভাবে গান লিখে থাকেন, প্রতিদানের জন্য নয়। এধরনের মান আমাদের দেশে খুব কম।
শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে নিয়ে আরো কথা বলেন, তার প্রথম অ্যালবামের গায়ক মোখলেসুর রহমান নীলু, সঙ্গীত পরিচালক মানাম আহমেদ, গীতিকার লিটন অধিকারী রিন্টু, গায়ক রবি চৌধুরী প্রমুখ।
আয়োজনে খালি গলায় শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীর গান পরিবেশন করেন রবি চৌধুরী, মোখলেসুর রহমান নীলু।
দ্বিতীয় পর্বে সাকি আহমেদের সঞ্চালনায় নিজের গীতিকার জীবনের পথচলা তুলে ধরেন তরুণ মুন্সী।
তিনি বলেন, গানকে আমি হৃদয়ের গহীন থেকেই ধারণ করি। সহজ গান লিখতেই পছন্দ করি। গানের জন্যই লোভনীয় চাকুরি ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনে পা দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত গান আমাকে নিরাশ করেনি। গানের সঙ্গে পথচলাটা অনেক কষ্টের। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হিসেবে আমার অনেক লিমিটেশন আছে। আমি অল্পতেই তুষ্ট থাকতে পছন্দ করি।
স্বাগত বক্তব্যে আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জয় শাহরিয়ার বলেন, শিল্পের কদর করতে হলে তা নির্মোহভাবেই করা উচিত। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে বয়স ও লিঙ্গ কোনোটাকে মানদণ্ড বিবেচনায় না রেখে শিল্পকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে চাই।