ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন দেশটিতে যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মীরা।
ভেনেজুয়েলা সরকার, বিরোধী দল, জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) যৌথ তথ্যানুযায়ী, ভয়াবহ এই জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯৪৩ জন নিহত এবং ১০ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ১৬ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। প্রায় ৪৩ হাজার বাসিন্দা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর বেঁচে থাকার জন্য যে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা ধরা হয়, তা পার হয়ে যাওয়ায় এখন জীবিত মানুষ পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। লা গুয়াইরা অঞ্চলের মাকুতো এলাকায় একটি ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা এক মা ও তার তিন সন্তানকে উদ্ধারে টানা ৪০ ঘণ্টা চেষ্টা করার পর কোনো সাড়া না পেয়ে অভিযান স্থগিত করেছে ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল।
ইকুয়েডর দলের প্রধান মেজর হোর্হে মন্তানেরো হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “৭ দিন পার হয়ে যাওয়ায় সেখানে এখন আর কেউ জীবিত নেই বলেই আমাদের ধারণা।”
তবে এই ভয়াবহতার মধ্যেও অলৌকিকভাবে মঙ্গলবার (৩০ জুন) কারাকাসের একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল। বর্তমানে ভেনিজুয়েলার স্থানীয় কর্মীদের সহায়তায় বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো ভেনিজুয়েলায় চরম খাদ্যসংকট ও রোগব্যাপ্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আগামী তিন মাসে প্রায় ৫ লাখ মানুষকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার ফান্ডের আবেদন জানিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বর্তমানে চরম সংকটের মুখে। অন্তত তিনটি বড় স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং আরও ছয়টি আংশিক সচল রয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব ও টিকাদানের হার কম হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হাম, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার।
২৯ জুন রাতে একটি শক্তিশালী আফটারশকে কেঁপে ওঠে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকা। ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেকোনো সময় আবার বড় কম্পন শুরু হলে যেন দ্রুত বের হওয়া যায়, সেজন্য অনেকেই দরজার খিল খুলে রাখছেন ও জরুরি ব্যাগ গুছিয়ে রাখছেন।
এরই মধ্যে রাজধানীর তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কিছু দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ খুলতে শুরু করায় কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরছে। সরকারি তথ্যমতে, ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের জন্য ৬৯টি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ ‘প্রায় পুরোপুরি’ সচল করা সম্ভব হলেও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও আংশিক বিপর্যস্ত রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, আফটারশকের তীব্রতা কমে আসাটা ইতিবাচক হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।