• রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০২:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
তিন আয়োজক দেশের টানাপোড়েন সঙ্গে নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপ জানাল সুপারকম্পিউটার ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কতটা টেন্ডার বাণিজ্যে জড়িত দুজনকে পুলিশে দিলেন ডিএনসিসি প্রশাসক ২৪ ঘন্টায় হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে আমার পেছনে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিএনপি নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ৪ জুলাই ও দাফন ৯ জুলাই নাঈমকে মারধর: নেপথ্যে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান: স্পিকারের অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশের লক্ষ্যেই খেলবে বাংলাদেশ

তিন আয়োজক দেশের টানাপোড়েন সঙ্গে নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপ

ক্রীড়া প্রতিবেদক / ২১ Time View
Update : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

উত্তর আমেরিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো তিন দেশের যৌথ আয়োজনে বসছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ফলে লাখো ফুটবলপ্রেমীর এই মহাযজ্ঞ যেন এমন এক নৈশভোজের আয়োজন, যেখানে অতিথিরা পৌঁছানোর আগেই স্বাগতিকদের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।

 

গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে তিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবি তুললেও, বাস্তবে পুরো ৩৯ দিনের এই টুর্নামেন্টজুড়ে পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রাখা যে সহজ হবে না, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, উত্তর আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবই হবে সবচেয়ে বেশি। ফলে বাণিজ্য, অভিবাসন এবং মাদক পাচারের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে তিন দেশের পুরোনো মতবিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুই বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা ও মেক্সিকো এখনো ভুলে যায়নি যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তাদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্পের দেওয়া মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ দোকান থেকে মার্কিন মদ সরিয়ে নেয় এবং কানাডিয়ানদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

 

অন্যদিকে, কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছেন। কারণ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই মেক্সিকোকে ‘চীনা বিনিয়োগের প্রবেশদ্বার’ হিসেবে আখ্যায়িত করার অভিযোগকে মেক্সিকো অপমানজনক হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে আসর আয়োজন করছে। ১৬টি আয়োজক শহর এবং অসংখ্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল আয়োজন পরিচালনা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

হাজার হাজার সমর্থককে ম্যাচ দেখতে তিন দেশের সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি ও বাড়তি নজরদারি দর্শকদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ‘ইরান যুদ্ধ’ ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ যুক্ত হওয়ায় সীমান্ত পারাপারে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের কূটনৈতিক অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

গবেষকদের মতে, ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ আয়োজনে নারী বিশ্বকাপ সফল হলেও, ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ পুরুষ বিশ্বকাপ দুই দেশের ঐতিহাসিক বৈরিতার কারণে খুব সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু ফিফা এখনো আশাবাদী এবং তারা এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ বিশ্বকাপ হিসেবে দেখতে চায়।

 

আয়োজক দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা এই টুর্নামেন্টকে শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবেই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সমালোচনা মোকাবিলার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করছেন। বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য মেক্সিকোর ক্ষেত্রে।

 

বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকো সিটির প্রধান বিমানবন্দরের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সংস্কারাধীন এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি নিয়ে দেশটির ভেতরেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এছাড়া কয়েক মাস আগে মাদক কার্টেলগুলোর প্রকাশ্য সহিংসতাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

 

বর্তমানে পেনশন সুবিধা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে মেক্সিকোর শিক্ষক ইউনিয়ন দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা স্টেডিয়ামমুখী প্রধান সড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “দাবি পূরণ না হলে কিক-অফ হতে দেওয়া হবে না।”

 

তবে এত কিছুর মধ্যেও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, “এটি বিশ্বের সেরা ফুটবল উপভোগের সময়। আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই যে, আমরা শুধু সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ নই, আমরা একটি শক্তিশালী জাতিও।”

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক মাসব্যাপী এই ফুটবল কূটনীতি ভবিষ্যতে তিন দেশের ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট কিংবা ম্যাচে উপস্থিতির মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে আগ্রহী হলেও, টুর্নামেন্ট চলাকালে এমন কোনো বড় কূটনৈতিক বিতর্ক তিনি নিশ্চয়ই চাইবেন না, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।

 

ফুটবল যেমন অনিশ্চয়তায় ভরপুর, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর এই যৌথ আয়োজনও এক ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত এই ব্যতিক্রমী বিশ্বকাপ কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category