রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের দায়ের করা জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট।
রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার জেল আপিল দায়ের করেন।
গত ৯ জুন পল্লবীর আলোচিত শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ে স্বাক্ষর করার পর সেটি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী, কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়াই ডেথ রেফারেন্স মামলা নামে পরিচিত।
গত ৭ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না খাতুনকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। আদালত নির্দেশ দেন, এই অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের প্রদান করতে হবে।
রায়ে আরও বলা হয়, নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের বুঝিয়ে দিতে হবে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পল্লবীতে এই আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরদিন ২০ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে রামিসার বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানো এবং মরদেহ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
ঘটনার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। মাত্র চার দিনের মধ্যে, ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। চার্জশিটে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়।
পরবর্তীতে ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন আদালত। ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই দিনই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য, জেরা ও জবানবন্দি গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা।
৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন নির্ধারণ করেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা ঘর থেকে বের হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় স্বপ্না কৌশলে তাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে সোহেলের বাসার দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান তিনি। বহুবার ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ভবনের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে তার মাথা দেখতে পান তারা।
পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়।