ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে দমকল বাহিনী। ফ্রান্সে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর বোর্দোর দিকে দ্রুত আগুন ধেয়ে আসতে থাকায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো সোমবার (২৭ জুলাই) এক জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক আহ্বান করেছেন। খবর বিবিসির।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানল তাণ্ডব চালাচ্ছে। এই দুই দেশে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) বোর্দোর মেয়র থমাস কাজেনাভ জানান, আগুন বর্তমানে শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আগামী তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস এই বিশাল আগুন মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, শহরের প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার নাগরিককে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
বোর্দোর আশেপাশের অঞ্চল থেকে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, আগুন খুব অনিয়মিত ও অনিশ্চিতভাবে শহরের দিকে এগোচ্ছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) থেকে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা বেড়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্ডি বলেন, “আগুন কীভাবে ছড়াবে তা আমরা নিশ্চিত নই, কারণ এর সামনের অংশ প্রতিনিয়ত দিক পরিবর্তন করছে। আমরা সরাসরি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছি না।”
তিনি পরিস্থিতিটিকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথের মতো অসম লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার মতে, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে হয় ‘টানা তিন দিন মুষলধারে বৃষ্টি’ হতে হবে, অথবা ফায়ার সার্ভিসকে কৌশলে আগুনটিকে এমন স্থানে নিয়ে যেতে হবে যেখানে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিভে যাবে, যেমন- সমুদ্রের দিকে।
এই দাবানলে ফ্রান্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। আর চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকেই কেবল ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, স্পেনের পরিস্থিতিও দিন দিন অবনতি হচ্ছে। রবিবার (২৬ জুলাই) দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ার কাছে একটি নতুন দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আগুন নেভাতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শহরটি থেকে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সোমবার ভ্যালেন্সিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনে যাবেন স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা। তার মতে, আগুনগুলো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
রবিবার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মাদ্রিদের পশ্চিমে আভিলা প্রদেশের দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে সতর্ক করে বলেন, “সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় আসছে।” তিনি জলবায়ু জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় জাতীয় সমঝোতার আহ্বান জানান।
রাজধানীর দক্ষিণ-পশ্চিমে ভিলামান্তারে একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ বলেন, এই দাবানল দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের ‘অপূরণীয়’ ক্ষতি করেছে।
রবিবার স্পেনের পরিবেশগত রূপান্তর বিষয়ক মন্ত্রী সারা আগেসেন জানান, স্পেনে আগুনে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরো যোগ করেন, আভিলা অঞ্চলে জ্বলতে থাকা দাবানলটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল।
বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়া বাসিন্দাদের একজন হলেন ৫০ বছর বয়সী ওলগা কঙ্গাচা। মাদ্রিদের পশ্চিমে অবস্থিত তার নিজ গ্রাম রোবলেদো দে চাভেলা থেকে দ্রুত পালিয়ে আসতে হয় তাকে।
তিনি জানান, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা শুনে তিনি ‘আতঙ্কিত’ হয়ে পড়েছিলেন। আমি কাঁদব নাকি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সেটা এমন একটা মুহূর্ত ছিল যখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।”
ওষুধ নিতে রবিবার অল্প সময়ের জন্য ঘরে ফিরে তিনি দেখতে পান পুরো রাস্তাঘাট জনশূন্য এবং তার ঘর ছাই দিয়ে ঢেকে গেছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলার আশেপাশের অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত ৯০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।