• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

কক্সবাজারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, ত্রাণ পৌঁছায়নি এখনো

কক্সবাজার প্রতিনিধি / ১৭ Time View
Update : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে থাকলেও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, খাবারের অভাবে ভুগছে এ অঞ্চলের মানুষ। এছাড়া এসব এলাকায় এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ পৌছায়নি।

সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।

এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায়, বন্যার পানিতে নলকূপ বসতঘর, শৌচাগার, পশুপাখির খোয়াড় ও বিশুদ্ধ পানির উৎস গভীর নলকূপ পানির নিচে। ফলে এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে না। বাধ্যতামূলক অনেকে বন্যার পানি ব্যবহার করছে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন।

এদিকে বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেক পরিবার গবাদিপশু ও সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু স্থান কিংবা ঘরের মাচায়। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিবিরখীল এলাকার আলম মন্ডল বলেন, “ঘরে এখনো পানি। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর জায়গা নেই, মাচায় কোনোমতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকছি। চুলা জ্বালাতে না পারায় কয়েকদিন ধরে রান্না করতে পারিনি। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানিরও সংকট। শৌচাগারও পানির নিচে থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটছে। ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর দ্রুত ত্রাণ।”

হারবাংয়ের রোকেয়া বেগম বলেন, “নলকূপ ডুবে গেছে। বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। বাচ্চাদের নিয়ে খুব ভয় লাগছে। প্রয়োজনীয় সেনিটারি নেপকিন পাওয়া যাচ্ছে না। ত্রাণ নেই। সব মিলিয়ে আমরা অসহায় জীবন যাপন করছি৷

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শিক্ষার্থীরাও। অনেকের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভেসে গেছে।

রসুলাবাদের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলে, “আমার সব বই-খাতা নষ্ট হয়ে গেছে। সামনে পরীক্ষা। এখন কীভাবে পড়ালেখা করব বুঝতে পারছি না।”

স্থানীয়দের মতে, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, দীর্ঘদিন ধরে মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

কক্সবাজার পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, “মাতামুহুরী নদী খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরই এ ধরনের দুর্যোগ আরো ভয়াবহ হবে। শুধু ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী। কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করায় বন্যার সময়ও সময়মতো গেট খোলা হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজ উদ্দিন বলেন, “সময়ে গেট খুললে এতদিন পানি আটকে থাকত না। মানুষের দুর্ভোগও অনেক কম হতো।”

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকায় স্লুইসগেট খুললেও পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। নদীর পানি কমে গেলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।”

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, “বন্যাকবলিত সব ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। যেসব দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানে নৌকার মাধ্যমে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার বাইরে রাখা হবে না।”

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।”

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category