দেশে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণে গতি ফিরলেও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় তিন গুণ হয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় এই ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ ঘটেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের মে মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাস শেষে কৃষি খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে। এসব ব্যাংকে এক বছরে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি। কৃষি খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬৫ শতাংশই এখন এই দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের হাতে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষিখাতে খেলাপি ঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক বছরে তা ৩ হাজার ৯৯ কোটি টাকা থেকে ৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১৬৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬০ কোটি টাকায়। তবে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর কৃষিখাতে কোনো খেলাপি ঋণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের কিস্তি বা পুরো অর্থ পরিশোধের নির্ধারিত সময় পার হলেই তা বকেয়া হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে গ্রেস পিরিয়ড কমিয়ে আনা এবং সময়সীমা কঠোর করায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ কৃষিঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৯ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৩৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) আরো ১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বিতরণ করায় মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরের একই সময়ে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ হয়েছিল ৩৩ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছিল। পরে কিছুটা কমলেও এপ্রিল ও মে মাসে আবার ঋণ বিতরণে গতি ফিরে আসে।
দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৬ শতাংশ এ খাতনির্ভর। তাই কৃষিঋণের গুণগত মান বজায় রাখা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।