বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চারিত একটি নাম- কুমিল্লা বিভাগ। ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক গুরুত্বের বিচারে কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি নতুন নয়। বরং, এটি বৃহত্তর কুমিল্লাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও আন্দোলনের ফল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- এর বক্তব্যে আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণার বিষয়টি। তিনি কুমিল্লার বরুড়ায় আয়োজিত একটি পথসভায় বলেছেন- দাবিটি যদি জনগণের হয়ে থাকে, তাহলে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়িত হবে। প্রধানমন্ত্রীর এমন কৌশলী বক্তব্যে আশাহত হয়েছে কুমিল্লাবাসী। কুমিল্লাবাসী মনে করে- আশার আলো জ্বললেও, বাস্তবতা এখনো “যদি” আর “কিন্তু”-তেই আটকে আছে।
কুমিল্লা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ। একসময় এটি ছিল বৃহত্তর ত্রিপুরা জেলার কেন্দ্র। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিক্ষাক্ষেত্রে কুমিল্লার অবদান অনস্বীকার্য। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরসহ পাশ্ববর্তী জেলাসমূহকে ঘিরে একটি সম্ভাবনাময় প্রশাসনিক অঞ্চল গড়ে উঠতে পারে- এমন বিশ্বাস বহুদিনের। ফলে বিভাগ ঘোষণার দাবি কেবল আবেগ নয়, এটি বাস্তব প্রয়োজনও।
কুমিল্লার পথসভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কুমিল্লা বিভাগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় মানুষের মধ্যে আবারও সংশয় তৈরি হয়েছে। অতীতেও নানা সময়ে রাজনৈতিক নেতারা কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। বরং, নামকরণ ও প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে বিষয়টি বারবার পিছিয়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে- এবারও কি কুমিল্লা বিভাগ শুধুই রাজনৈতিক আশ্বাস হয়েই থাকবে?
একটি বিভাগ ঘোষণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন সুপরিকল্পিত প্রশাসনিক প্রস্তুতি। কুমিল্লার অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, সরকারি দপ্তর স্থাপনের সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা- সবদিক থেকেই এটি বিভাগ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। বরং, বিভাগ হলে ঢাকার ওপর প্রশাসনিক চাপ কমবে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, কেবল বক্তব্য বা ইঙ্গিত দিয়ে মানুষের প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা যায় না। কুমিল্লাবাসী এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, চায় দৃশ্যমান উদ্যোগ ও চূড়ান্ত ঘোষণা। রাজনৈতিক বক্তব্যের আবেগের বাইরে এসে সরকারকে এখন পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, উন্নয়নের প্রশ্নে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা সময়ের দাবি।
কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণার বিষয়টি এখন জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তাই “হবে কি হবে না”- এই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ। অন্যথায় কুমিল্লা বিভাগের স্বপ্ন আবারও “যদি” আর “কিন্তু”-র গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে।