• মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন

অর্থাভাবে অনিশ্চিত জিপিএ-৫ পাওয়া ফারজানার পড়ালেখা

গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

অদম্য মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ফারজানা আক্তার। স্বপ্ন তার ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার। কিন্তু অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন থমকে যাওয়ার পথে। অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে মেধাবী এই শিক্ষার্থীর।

ফারজানা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রামানন্দ গ্রামের সরদার বাড়ির মজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ মেয়ে। সে উপজেলার পশ্চিম তাফালবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। চার সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ফারজানার বাবা। দিনমজুরের কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে সংসারের নিত্যদিনের খরচ চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে ফারজানার একমাত্র ভাই প্রতিবন্ধী। তার বড় বোনও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিলেন। পরে অর্থের অভাবে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। বড় বোনের মতোই ফারজানার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বড় বাধা পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।

দুর্গম এলাকার এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ ছিল না ফারজানার। নিজের অদম্য চেষ্টা, নিয়মিত অধ্যয়ন ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় সে অর্জন করেছে কাঙ্ক্ষিত এ সাফল্য। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকেছে সে।

ফারজানার শিক্ষকরা জানান, তার মতো মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী তারা খুব কমই দেখেছেন। কোনো বিষয় একবার বুঝিয়ে দিলে ফারজানা তা সহজেই আয়ত্ত করতে পারত। পশ্চিম তাফালবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে ফারজানার মতো এত পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। একটি বিষয় একবার আলোচনা করলেই খুব দ্রুত আয়ত্ত করতে পারত। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও সে নিয়মিত স্কুলে এসেছে। আর্থিক সহযোগিতা পেলে তার পড়াশোনার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। সে ভবিষ্যতে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু সহযোগিতা না পেলে তার পরিবারের পক্ষে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হবে না।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান সাংবাদিক সঞ্জিব দাসকে বলেন, ‘আমার ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেছে; কিন্তু ফারজানার মতো মেধাবী শিক্ষার্থী আমি দেখিনি। স্কুলের বাইরে সে কোনো কোচিং বা প্রাইভেট পড়েনি। নিজের প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমেই এই সাফল্য অর্জন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফারজানার বড় ভাই-বোনেরাও অর্থের অভাবে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। আমরা চাই, ফারজানার ক্ষেত্রে যেন একই পরিণতি না হয়। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে মেয়েটি তার স্বপ্ন পূরণ করে দেশ ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।’

ফারজানার বাবা মজিবুর রহমান বলেন, ‘দিনমজুরি করে আমার একার আয় দিয়ে চারজনের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। মেয়েটা এত ভালো ফল করেছে, কিন্তু টাকার অভাবে যদি তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়; এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?

নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে ফারজানা আক্তার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন আমি ডাক্তার হবো। অনেক কষ্ট করে, কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে প্রতিদিন স্কুলে গিয়েছি। নিজের চেষ্টা দিয়ে আজ এই পর্যন্ত এসেছি। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছি। কিন্তু এখন আমার পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে গেছে শুধু টাকার অভাবে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারজানা আরও বলে, ‘সরকার বা সমাজের কেউ যদি আমাকে সহযোগিতা না করেন, তাহলে আমার পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। টাকার অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। আমি শুধু পড়াশোনা করে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category