প্রতিরক্ষা নীতি এবং সামরিক খাতের অপ্রতুল বাজেট ও উপেক্ষিত কৃষি খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই দুই আতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো উচিৎ বলে মনে করেনঅর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিচ স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। তার মতে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতকেন্দ্রিক হয়ে থাকায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা নীতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে রয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে বাজেটে বরাদ্ধ বাড়াতে হবে।
বুধবার (১৭ জুন) বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে অবস্থিত ইআরএফ অডিটোরিয়ামে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (ওআইআরডি) আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট : উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে আলোচক হিসেবে তিনি এমন বক্তব্য দেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ওআইআরডির চেয়ারম্যান এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব।
তিনি বলেন, বর্তমান বাজেটে সামরিক খাতের জন্য ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এর সিংহভাগই ব্যয় হয় বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাজে। প্রকৃত সামরিক সরঞ্জামের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ১ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে একটি আধুনিক এয়ারক্রাফট কেনাও সম্ভব নয়।
ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা নীতি অনেকটা ভারতকেন্দ্রিক হয়ে আছে, যা শক্তির পরিবর্তে পরনির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।
তবে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কাছ থেকে ড্রোন ও এয়ারক্রাফট সংগ্রহের জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বাজেট আলোচনার বিষয়টিকে তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখন করেন।
ড. মো. মিজানুর রহমান বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেটে কৃষিখাতে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়। বর্তমান সরকার মুখে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো কথা বললেও বস্তুতপক্ষে সার্বিক বাজেট গ্রোথের সঙ্গে এই খুবই সামান্য বাড়ানো হয়েছে। এ বছর জাতীয় বাজেট ১৭-১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও কৃষিখাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ, যা মূলত কৃষকদের ঠকানোর শামিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কৃষিখাতে ১৭-১৮ হাজার কোটি টাকার যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার বড় একটি অংশই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। সাধারণ কৃষকরা এই সুবিধার খুবই সামান্য পায়। এক্ষেত্রে অমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা সমালোচনা করে বিশ্লেষক বলেন, ব্যক্তিগত আয়কর সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭৫ লাখ টাকা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার মতে, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ফলে এই বৃদ্ধি কোনো কাজে আসছে না। উপরন্তু ট্যাক্স স্ল্যাব বা ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। আগের হিসেবে ৫ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে যেখানে ১০ হাজার টাকা কর দিতে হতো, নতুন নিয়মে সেখানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হচ্ছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (বিআইজিএম) সহযোগী অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানত প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ বা ‘উচ্চাভিলাষের’ প্রতিফলনই বেশি দেখা যাচ্ছে।
এই বিশ্লেষক বলেন, উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক অর্থনীতি এবারের বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা জনকল্যাণমূলক খাতে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাজেট মূলত ভোটার বা নাগরিকদের সন্তুষ্ট করার একটি প্রবণতা এবং এটি মূলত একটি সিটিজেন সেন্ট্রিক বা নাগরিক-কেন্দ্রিক বাজেট হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।