দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বাড়াতে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থার মেয়াদ তিন বছর করা, প্রতিটি প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, ক্লাসরুমে প্রযুক্তির ব্যবহার, ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির রূপরেখা এবং বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর জন্য সরকারের তদারকি নীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের নতুন ফ্রেমওয়ার্ক ও পিটিআই সক্ষমতা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অপ্রশিক্ষিত অবস্থায় দীর্ঘ সময় ক্লাসরুমে দায়িত্ব পালনের বর্তমান ধারাকে একটি নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে আনা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে পারদর্শী করতে প্রশিক্ষণের নতুন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ক্লাসে ফিরে যাবেন।
এরপর নির্ধারিত সিলেবাস বা মডিউল অনুযায়ী বাকি সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে (আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে) তাদের প্রশিক্ষণ মডিউল ও পরীক্ষাগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থা এক বছর নির্ধারণ করে একটি নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। সম্প্রতি নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ব্যাচগুলো এই মডিউল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পাবে। প্রথমে শিক্ষকরা পিটিআইতে দুই মাস ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্লাসরুমে পাঠদানে চলে যাবেন।
ববি হাজ্জাজ আরো জানান, বর্তমানে পিটিআইগুলোর বার্ষিক প্রশিক্ষণের সক্ষমতা প্রায় সাত হাজারের মতো রয়েছে। এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য শুধু পিটিআই নয়, প্রয়োজনে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এডুকেশন ডিপার্টমেন্টকে যুক্ত করে শিক্ষকদের আধুনিক শিখনপদ্ধতিতে পারদর্শী করে তোলা হবে। একই সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও প্রযুক্তির ইকোসিস্টেম
শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এটি শুধু একটি ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়ার প্রকল্প নয়।
তিনি বলেন, ‘গুগলসহ বৈশ্বিক বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আমরা ক্লাসরুমের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করছি। এর মূল কানেক্টর হিসেবে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছানো হবে।’
এ ছাড়া যেসব দুর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেগুলোতে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যৌথ সমঝোতার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন ও ব্যান্ডউইথ নিশ্চিতের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
আগামী বছর থেকে সারা দেশে ‘মিড-ডে মিল’
শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি ধরে রাখা ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি ‘মিড-ডে মিল’ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় মিড-ডে মিল চালু রয়েছে। বাকি উপজেলায় এই কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এসংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি—আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ
সারা দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা প্রসঙ্গে আদালতের রায়ের বিষয়টি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রমের আইনি প্রক্রিয়া এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে এ বিষয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়ের চূড়ান্ত কপি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। এটি সম্পন্ন হলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন শিক্ষক নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হবে। তখন বিপুল পরিমাণ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।’
সুত্র: বাসস