ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ও বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা হলেও স্বজনদের আর্তনাদে এক হৃদয় বিদায়ক পরিস্থিতিতে রুপ নিয়েছে ভুমিকম্পে আক্রান্ত হওয়া দেশটির শহরগুলো। সপ্তাহ পূর্বে হওয়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১,৭০০ ছাড়িয়ে গেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জর্ডানের সংবাদমাধ্যম রোয়া নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর পাঁচ দিন পার হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসায় এখন মরদেহ উদ্ধারের কাজই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লা গুয়াইরা বন্দরের একটি বিশাল গুদামকে রূপান্তর করা হয়েছে অস্থায়ী মর্গে। সেখানে শত শত সাদা ও কালো বডি ব্যাগ এবং কফিন সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে স্বজনদের দ্বারা শনাক্তকরণের জন্য। বাইরে অপেক্ষমাণ ডজনখানেক পরিবারের চোখে-মুখে কেবলই আর্তনাদ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির কাছে নিজের ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে উইলকার মোলাল্লা নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমার পরিবারে ১১ জন সদস্য ছিল। শুধু আমি আর আমার এক ভাই বেঁচে আছি, কারণ আমরা তখন কাজের সূত্রে বাইরে ছিলাম। আমার বোন, তার সন্তান এবং ভাইয়ের সন্তানরা সবাই ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে চলে গেছে।”
এদিকে, মার্কিন নৌসেনারা (ইউএস মেরিনস) সরবরাহ ও সরঞ্জাম সরবরাহের সুবিধার্থে ভেনেজুয়েলার দুটি প্রধান বন্দরের একটি মেরামত সম্পন্ন করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “লা গুয়াইরা বন্দরটি এখন চালু হয়েছে। ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল নামক একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী ও সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য বন্দরটি ব্যবহার করছে।”
পাশাপাশি, কারাকাসের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত সাইমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্যরা সেখানে রানওয়ে ও এয়ার ট্রাফিক সচল করতে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করছেন।
দুর্যোগের ৭২ ঘণ্টার ‘ক্রিটিক্যাল উইন্ডো’ পার হয়ে যাওয়ার পরও সোমবার (২৯ জুন) তানাগুয়ারেনা শহরে অ্যারন লেভি নামে ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জটিল এক অভিযানের মাধ্যমে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্যানুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭১৯ জন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর জিয়ানলুকা রামপোল্লা ডেল টিন্ডারো জানিয়েছেন, বিশ্ব সংস্থাটি ভেনেজুয়েলাকে ১০ হাজার বডি ব্যাগ সরবরাহ করবে।
সোমবার (২৯ জুন) একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে টিন্ডারো বলেন, “এটি খুবই দুঃখজনক এবং আমরা সত্যিই আশা করি যে প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে কম হবে।”
ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা তাদের মার্কিন-সমর্থিত সরকারের ধীরগতির দুর্যোগ প্রতিক্রিয়ায় ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে প্রায় ৩ হাজার ১৫০ জন আহত হয়েছেন, যা প্রতিবেশী কলম্বিয়াতেও অনুভূত হয়েছিল। এটি ছিল গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্পে দুর্বল হয়ে পড়া শত শত ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবার জাতিসংঘের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর টিন্ডারো জানান, ২৭টি দেশ ভেনেজুয়েলায় ৪০টিরও বেশি অনুসন্ধান দল পাঠিয়েছে। তিনি আরো যোগ করেন, “কমপক্ষে ২৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।”
গত জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে ভেনেজুয়েলার প্রধান ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক যুক্তরাষ্ট্র সোমবার তাদের আগের ত্রাণের প্রতিশ্রুতি ১৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করেছে।
অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটি এই দুর্যোগ মোকাবিলা করার ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়েছে। তুকা কাস অঞ্চলের এক সমাজকর্মী আক্ষেপ করে বলেন, “যদি সময়মতো অনুসন্ধান চালানো হতো, তবে হয়তো অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।”
ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে নামার জন্য সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক নাগরিক সৈন্যদের উদ্দেশ্য করে বলছেন, “দেশের এখন আপনাদের প্রয়োজন, অস্ত্র রেখে কোদাল আর বেলচা তুলে নিন।”
লা গুয়াইরা শহরে লুণ্ঠন ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগ অংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, ফার্মেসি, সুপারমার্কেট এবং অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়েছে। কেউ কেউ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ধীরগতিতে এবং সামান্য পরিমাণে আসা ত্রাণের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সরকার জানিয়েছে, যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, জনসংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়, পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ত্রাণ সামগ্রীর প্রয়োজন হবে।