আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিমান ও ড্রোন হামলা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো ৫৮ জন।
ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে হামলা তীব্র করার পাশাপাশি ব্যাপক হারে এলাকা ছাড়ার নির্দেশও জারি করেছে। খবর আল-জাজিরার।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোরে সাইদা ও টায়ার শহরের সংযোগকারী প্রধান সড়ক ‘আদলৌন হাইওয়ে’ দিয়ে সপরিবারে এলাকা ছাড়ার সময় একটি ইসরায়েলি ড্রোন হামলার শিকার হন সাধারণ নাগরিকরা। এতে একই পরিবারের ছয় সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা মূলত হিজবুল্লাহর সামরিক ‘অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে এই অভিযান চালাচ্ছে। তবে ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি বলছে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননজুড়ে আবাসিক এলাকা, রাস্তাঘাট ও বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে।
এই আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না লেবাননের নিয়মিত সেনাবাহিনীও। লেবানন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নাবাতিহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের আরও এক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ লেবানন এবং পশ্চিম বেকা উপত্যকা জুড়ে ইসরায়েলি হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
ইসরায়েল টায়ার ও আশেপাশের এলাকাসহ দক্ষিণের একটি বড় অংশ জুড়ে এলাকা খালি করার বড় নির্দেশ জারি করেছে। বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে এবং লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ‘জহরানি নদী’র উত্তরে সরে যেতে বলা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট ভবন চিহ্নিত করে দেওয়া এই নির্দেশগুলো হাজার হাজার মানুষকে হামলার হুমকির মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
টায়ার শহর থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা ওবায়দা হিত্তো জানান, “মধ্যরাত থেকে শহরটিতে ডজনেরও বেশি বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হামলার ভয়ে সারাদিন ধরে মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়েছেন। বর্তমানে পুরো শহরটি প্রায় সম্পূর্ণ জনশূন্য ও থমথমে হয়ে পড়েছে।”
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি এই গণ-বাস্তুচ্যুতির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, জনবহুল শহরগুলোতে ক্রমাগত বোমাবর্ষণ ও জোরপূর্বক সাধারণ মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া বেসামরিক নাগরিকদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং লেবাননে চলমান মানবিক বিপর্যয়কে আরো প্রকট করে তুলছে।
বৈরুত থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা জেইনা খোদর জানান, গত মাসে কার্যকর হওয়া মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, “এটি কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। দক্ষিণ লেবানন মূলত একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই রয়ে গেছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “তবে গত তিন বা চার দিনে আমরা দক্ষিণ লেবানন জুড়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভারী ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ দেখেছি, যা গত মার্চের শুরুতে এই সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে তীব্র।”
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় আলোচনা আজ বৃহস্পতিবার পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। শুরুতে প্রযুক্তিগত আলোচনা এবং পরে জুনের শুরুতে আরো বড় পরিসরে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও, ঠিক তার আগেই এই সংঘাতের তীব্রতা বাড়ল।
ইসরায়েল গত দুই দিনে তাদের সামরিক অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে, যা কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
হিত্তো বলেন, “এই আলোচনা কীভাবে এগিয়ে যাবে তা স্পষ্ট নয়। এখানকার মানুষ খুব হতাশ, তারা চায় লেবানন সরকার এই আলোচনায় আরো দৃঢ় অবস্থান নিক, কিন্তু আপাতত তেমন কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না।”
শিপ্র/শাহোরা/