গোলাম মোস্তাফিজার রহমান মিলন, হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ::
শীত এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। এরই মধ্যে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে আগাম শীতকালীন সবজি। ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শিম, টমেটো, বেগুন, পালংশাকসহ নানা ধরনের সবজিতে সবুজ হয়ে উঠেছে কৃষিজমি। আগাম উৎপাদিত এসব সবজি বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারদর ওঠানামার কারণে সেই হাসি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। কেউ জমি থেকে সবজি তুলে বাজারে নিচ্ছেন, আবার কেউ ক্ষেতেই পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো পাচ্ছেন তাঁরা।
কৃষকেরা জানান, আগাম সবজি চাষে সাধারণ মৌসুমের তুলনায় পরিচর্যা ও বিনিয়োগ কিছুটা বেশি করতে হয়। জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। তবে মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির সরবরাহ কম থাকায় ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভের আশা করছেন তাঁরা।
এক কৃষক বলেন, ‘আগাম সবজি চাষ করতে শুরুতেই অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। প্রতিদিন জমিতে পরিচর্যা করতে হয়। এখন বাজারে ভালো দাম পাচ্ছি। এভাবে দাম থাকলে খরচ উঠিয়ে কিছু লাভ করতে পারব।’
আরেক কৃষক বলেন, ‘একই জমিতে পরিকল্পনা করে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছি। আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে সাধারণ সময়ের চেয়ে ভালো দাম পাওয়া যায়। তবে বীজ, সার ও শ্রমিকের খরচ অনেক বেড়েছে। তাই বাজারে দাম ভালো থাকাটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি।’
তবে কৃষকের এই স্বস্তির পাশাপাশি রয়েছে কিছু শঙ্কাও। তাঁদের আশঙ্কা, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যেতে পারে। অন্যদিকে উৎপাদন উপকরণের বাড়তি দাম লাভের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় উৎপাদিত সবজি দ্রুত বিক্রি করতে হয়। ফলে পাইকারদের নির্ধারিত দামের ওপর নির্ভর করতে হয় কৃষকদের।
কৃষকদের মতে, মাঠপর্যায়ে উৎপাদিত সবজির দাম আর খুচরা বাজারে ভোক্তার কেনা দামের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরি করা গেলে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে সবজি কিনতে পারবেন।
ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান বলেন, ‘উপজেলায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। চলতি মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। আগাম উৎপাদিত সবজি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, কৃষকেরা উৎপাদন খরচ কমিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে বেশি লাভবান হোন।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমদেল হোসেন বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চারা রোপণ, জমির পরিচর্যা, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। রোগবালাই দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঠিক নিয়মে চাষাবাদ করলে ভালো ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আগাম শীতকালীন সবজি চাষ কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমের শুরুতে সরবরাহ কম থাকায় কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন। তবে ভালো ফলনের জন্য জমির উর্বরতা বজায় রাখা, পরিমিত সার ও সেচ ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি জমিতে সবজি চাষে আগ্রহী হবেন।’
সব মিলিয়ে ঘোড়াঘাটে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় আপাতত স্বস্তিতে থাকলেও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের সবজি চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।