জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসনের কাছ থেকে একবছরে ১৮ লাখ টাকা পেলেও সাড়ে ৩ কোটি টাকার কাজ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে– বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অর্থের পাশাপাশি স্পনসরশিপ ও বিভিন্ন অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গত একবছরে মোট ৩৩৮টি কর্মসূচি বাস্তবায়নের তথ্য জানিয়েছে জাকসু।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) জাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত বিদায়ি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির একবছরের কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাব তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ফেরদৌস আল হাসান বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় ও অর্থায়নের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
এজিএস ফেরদৌস আল হাসান জানান– শিক্ষার্থীদের সুবিধা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে কম্পিউটার সরবরাহে প্রায় ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। একইভাবে ২১টি হলে গরম ও ঠান্ডা পানির আধুনিক ফিল্টার স্থাপনে প্রায় ৭ লাখ টাকা, প্রতিটি হলে হুইলচেয়ার দিতে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ১৬টি হলে ধর্মীয় পাঠাগার ও কেন্দ্রীয় মন্দিরে পাঠাগার স্থাপনে প্রায় ৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ক্যারিয়ার উন্নয়নেও বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করে জাকসু। বিনামূল্যে আইইএলটিএস কোর্স, বেসিক ও অ্যাডভান্সড কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইংরেজি ও জাপানি ভাষা শিক্ষা, গবেষণা পদ্ধতি, উপস্থাপনা দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন সেশন আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন বলে।
জাকসুর উদ্যোগে ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষাবিষয়ক একাধিক এক্সপো এবং চাকরি মেলারও আয়োজন করা হয়। জাকসুর তথ্যমতে, চাকরি মেলায় প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। কর্মসূচিটির মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৬ লাখ টাকা। তবে এতে জাকসুর নিজস্ব ব্যয় ছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা এবং বাকি অর্থ স্পনসরদের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হয় বলে জানান এজিএস।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, রক্তদাতা ও গ্রহীতাদের সংযোগ, টিউশন খোঁজা এবং শিক্ষার্থী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। ‘টিউটর হাব’, রক্তসংযোগ প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট তৈরিতেও জাকসু অর্থ ব্যয় করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ক্যাম্পে ৮০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সেবা নেন বলে জানানো হয়।
এ ছাড়া মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নে প্রায় ২৫ লাখ টাকার কাজ, শিক্ষার্থীদের বাসে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, বিভিন্ন হলে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, চার্জিং স্টেশন স্থাপন, নারী শিক্ষার্থীদের সাইকেল ও স্কুটি প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হিসাব তুলে ধরেন এজিএস।
ফেরদৌস আল হাসান বলেন, এসব কর্মসূচির বড় একটি অংশ স্পনসরশিপ ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের তুলনায় এক বছরে বাস্তবায়িত কাজ ও কর্মসূচির আর্থিক মূল্য কয়েক গুণ বেশি হয়েছে বলে জাকসুর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, এক বছরের কার্যক্রমে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন জাকসুর নেতারা। তাদের ভাষ্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব, ঘন ঘন দায়িত্ব পরিবর্তন এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট জটিলতার কারণে কিছু কাজ প্রত্যাশিত গতিতে করা সম্ভব হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রায় এক মাস কার্যক্রম শুরু করতে সময় লেগেছে বলে তারা জানান। জাকসুর সম্পাদকদের জন্য যথাযথ কর্মপরিসর, কম্পিউটার অপারেটর ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতির কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘জাকসুর অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল, কিছু জায়গায় আমরা সবকিছু করতে পারিনি। তবে জাকসু এক বছর দেখিয়ে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে অনেক কাজ করা সম্ভব। আমরা চাই জাকসুর ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। দায়িত্ব শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের কাজ ও দায়িত্ব শেষ হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবিলম্বে জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ ও তফসিল ঘোষণা করতে হবে। জাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সুন্দর মেলবন্ধন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি জবাবদিহির পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, এই এক বছরে জাকসুর ভিপি ও বিভিন্ন সম্পাদকদের মধ্যে কে কার চেয়ে বেশি কাজ করবে এমন একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ছিল। জাকসুর অনুপস্থিতিতে এই কর্মব্যস্ততা ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।