দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে বাধ্য হবেন বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ভুল নিউজের মাধ্যমে আমার মানহানী হয়েছে। যা আপনাদের (দুদক) বরাতে করা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে অনুসন্ধান নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহার ও দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানাচ্ছি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর বাংলামটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই আল্টিমেটাম দেন আসিফ মাহমুদ।
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক এমডিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক
এ সময় দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, আমার যে মানহানি হয়েছে, এটার জন্য আপনারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাপোলজি করবেন এবং যে নিউজগুলো আপনাদের বরাত দিয়ে করা হয়েছে, সেগুলো উইথ ড্র করবেন। অন্যথায় আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো এবং মানহানির মামলা করতে বাধ্য হবো।
আসিফ মাহমুদ বলেন, আজকে দুদকের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছে। সেখানে দুদকের মুখপাত্র প্রথমে বলেছেন, প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। তার ওই বক্তব্যের জের ধরে সব মিডিয়া নিউজ করেছে যে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। আমি বুঝতে পারলাম না, সকালে একটা জিনিসের অনুসন্ধানের রিপোর্ট আসল, বিকেলেই সেটার প্রমাণ কীভাবে পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, আমি ফেসবুকে পোস্ট করলাম, প্রমাণটা জাতির সামনে আপনারা উন্মুক্ত করেন। এরপর যেই কর্মকর্তা প্রেস ব্রিফিং করেছিলেন, তিনি দুদক বিটের সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ দিয়েছেন যে তার মুখ ফসকে সত্যতা প্রমাণ পাওয়ার কথাটা চলে এসেছে। তিনি সেখানে বলেছেন, এটা আপনারা কেউ প্রচার করবেন না। কিন্তু যারা টিভিতে লাইভ করে ফেলেছে, যারা নিউজ করে ফেলেছে, সেই নিউজগুলো তো পরে আর পরিবর্তন হয়নি। এখানে স্পষ্টতই আমার ব্যক্তিগতভাবে মানহানি হয়েছে।
দুদকের সংস্কার প্রসঙ্গে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা চেয়েছিলাম সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। সেই সংস্কারের মধ্যে দুদকের সংস্কারও আমরা চেয়েছিলাম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুদকের যে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল এবং দুদককে একটি শক্তিশালী দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, বিএনপি এসে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করল।
তিনি বলেন, এখন আমরা বুঝতে পারছি, এই অধ্যাদেশ কেন বাতিল করা হয়েছে। বিরোধী দল ও মতকে দমন-পীড়ন করার জন্য, সরকারের অপশাসন, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে বিরোধী দল যখন কর্মসূচি ও আন্দোলনে যাচ্ছে, তখন বিরোধী দলকে দমনের এক ধরনের প্রচেষ্টা হিসেবে, হাতিয়ার হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আবারো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার জন্যই তারা সংস্কারটা বাতিল করেছে।
গত কয়েক মাস দুদক কার্যত অকার্যকর ছিল দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেন, গত পাঁচ-ছয় মাসে যত দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, আমরা দেখেছি এখন আর দুর্নীতি গোপনে হয় না, সবকিছু সামনে সামনেই হয়। আমরা স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটালের ৪০ হাজার কোটি টাকার এক মন্ত্রী পুত্রের প্রজেক্ট নিয়ে যাওয়ার কথা শুনি। আরেকজন মন্ত্রী তার নিজের কোম্পানি, তার ছেলের নামের কোম্পানিকে স্থানীয় সরকার থেকে ৭১ কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে যাওয়ার কথা শুনছি। এই পাঁচ মাসে যে দুর্নীতিগুলো হলো, এগুলো কি ব্ল্যাক হোলে চলে যাবে, নাকি এগুলো নিয়েও তদন্ত হবে এটাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, আমার মনে হয়, দিনের আলোতে যে দুর্নীতিগুলো তারা করছেন, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে জড়িত হচ্ছেন, এই জিনিসগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আমাদের ওপর এই ধরনের আজগুবি বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দুদক অনুসন্ধানের নামে এক ধরনের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করছে।
নিজের ব্যাংক হিসাব চাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এর আগেও আপনারা দেখেছেন, আমার ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়েছে। আমি এখানেই সংবাদ সম্মেলন করে শুধু আমারটা চাওয়া হয়েছিল আমার পরিবারের সবার ব্যাংক হিসাব উন্মুক্ত করেছি। ব্যাংক হিসাব চাওয়ার মানে কী? জাস্ট এটা একটা নিউজ হবে, ভিলিফিকেশন হবে, ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন হবে। পরবর্তীতে এর কোনো ফলোআপ নেই।
দুদকের আজকের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আজকেও উনি বললেন সত্যতা পাওয়া গেছে, সবাই নিউজ করল সত্যতা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের লাখ লাখ, কোটি কোটি মানুষ জানল সত্যতা পাওয়া গেছে। পরে উনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ দিয়ে বললেন, এই কথাটা ব্যবহার করবেন না।
তিনি বলেন, আপনি সংবাদ সম্মেলনে বলছেন সত্যতা পাওয়া গেছে, আপনি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন যে সত্যতা পাওয়া যায়নি, আমার এই কথাটা মুখ ফসকে ভুলে বের হয়েছে। যদি তারা এটা না করে, তাহলে দুদকের পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াই আজ প্রথম দিনেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় নাগরিক হিসেবে সহযোগিতার কথা জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, জবাবদিহিতার স্বার্থে, একটি দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যেকোনো ধরনের তদন্তে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সহযোগিতা করা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থাকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, তদন্তকারী সংস্থা আজকে তদন্ত শুরু করে আজকেই বলে দিতে পারে না যে কারো বিরুদ্ধে সত্যতা পাওয়া গেছে। আবার সন্ধ্যাবেলায় সেই বক্তব্য উইথ ড্রও করতে পারে না। এই যে বক্তব্য উইথ ড্র করেছে, এটা মিডিয়ায় নিউজ হয়নি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে। যতটা সত্যতা পাওয়ার নিউজ হয়েছে, ততটা বক্তব্য প্রত্যাহারের নিউজ হয়নি।
ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন ও পারসেপশন তৈরির অভিযোগ করে তিনি বলেন, এই যে ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন, ভিলিফিকেশন, পারসেপশন মেকিং, ন্যারেটিভ বিল্ডিং এই জিনিসগুলোর জন্যই বারবার আমাদের নানাভাবে নানা অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, সেটার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, শক্তিশালী যুক্তি নেই, সলিড কিছু তারা তদন্ত করেও আসলে পান না।
সরকার বিরোধী মত দমনে ‘আওয়ামী লীগীয় কায়দা’ অনুসরণ করছে উল্লেখ করে এর থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, আপনারা বিরোধী দল, বিরোধী মতকে দমন-পীড়নের আওয়ামী লীগীয় কায়দা থেকে বের হয়ে আসুন। আমরা বিগত ১৫ বছরে আপনাদেরকে এটার ভিকটিম হতে দেখেছি।
তিনি বলেন, আপনারা বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনীতিটা যুক্তি-তর্ক দিয়ে করেন, সমালোচনার প্রত্যুত্তর দিয়ে করেন। কিন্তু এই নোংরা পদ্ধতিতে আবার যাবেন না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ খুব সচেতন।
নিজের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি খুব স্পষ্টভাবে এই বিষয়গুলো বললাম এবং আমি এটা কন্টিনিউ করব। আমার জায়গা থেকে যদি দুদক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার মানহানি করার জন্য অ্যাপোলজি না করে, তাহলে আমি লিগ্যাল নোটিশ দেব।