কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর লাকসাম থেকে উদ্ধার হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তাঁকে কেউ অপহরণ করেনি, বরং তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। শুক্রবার রাতে কুমিল্লা জেলা পুলিশের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ভুক্তভোগী নারীর দায়ের করা মামলায় জিসান মিয়া প্রধানকে আসামি করা হয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে জিসানকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে তাঁর পরিবার। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
২৮ বছর বয়সী জিসান মিয়া প্রধান ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১১ জুন রাতে জিসান নিখোঁজ হয়েছেন উল্লেখ করে তাঁর চাচাতো ভাই রাসেল আহম্মেদ দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর জেলা পুলিশের একাধিক টিম তাঁকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে এক ২৫ বছর বয়সী বিধবা নারীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয় এবং পরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পুলিশের দাবি, ওই সম্পর্কের জেরে নারীটি অন্তঃসত্ত্বা হলে জিসান তাঁকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেন। একপর্যায়ে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ভ্রূণ নষ্ট করা হয়। পরবর্তীতে ওই নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান ১২ জুন বিয়ের আশ্বাস দেন। তবে বিয়ে এড়াতে ১১ জুন রাতেই পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আত্মগোপনে যাওয়ার পর জিসান তাঁর চাচাতো ভাইকে দিয়ে থানায় নিখোঁজের জিডি করান। নিখোঁজের তদন্ত চলাকালে শুক্রবার রাতে লাকসাম এলাকা থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
জিসানকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর শুক্রবার রাতে ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় করা এ মামলায় ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কুমিল্লার সহকারী পুলিশ সুপার (দাউদকান্দি-চান্দিনা সার্কেল) খলিলুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে জিসানকে অপহরণ করা হয়নি; তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। এক নারীকে ধর্ষণ ও প্রতারণার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ভ্রূণ নষ্টসহ একাধিক অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে জিসানের পরিবারের দাবি, গত বৃহস্পতিবার তিনি ঢাকা থেকে দাউদকান্দিতে আসেন এবং রাত আটটার দিকে বাবাকে ফোন করে পৌঁছানোর কথা জানান। এরপর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়।
এ ঘটনায় জিসানকে অপহরণ করা হয়েছে দাবি করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান শুক্রবার বিকেলে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘১৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?’
এ ছাড়া ছাত্রশিবিরও এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, একটি চক্র জিসানকে অপহরণ করে তাঁর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি তখনও সক্রিয় ছিল এবং প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তর, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং র্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার দাবি জানানো হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন ‘মেয়েসংক্রান্ত বিষয়টি আমাদের কাছে শুক্রবার বিকেলে মেয়ের পরিবার জানিয়েছে। আমরা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছি। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে জিসানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত।’