• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:২০ অপরাহ্ন
আড়াই বছরের প্রকল্পে সাড়ে ৯ বছর

ঘোড়াশাল রি-পাওয়ারিংয়ে ব্যয়ও বেড়েছে ৪৩৫ কোটি টাকা

মো. শাহাদাৎ হোসেন রাজু / ৪১ Time View
Update : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং’ প্রকল্প। তবে দীর্ঘ এক দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়েও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি প্রকল্পটি। বরং বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল মাত্র আড়াই বছরে। কিন্তু নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতায় মেয়াদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ বছরে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। যদিও সংশ্লিষ্টরা বিলম্বের জন্য চুক্তিগত জটিলতা, দুর্ঘটনা, মামলা-মোকদ্দমা ও আন্তর্জাতিক আইনি বাধাসহ বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন, তবুও প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রস্তুতকৃত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথমে দুই বছর, পরে আরও এক বছর এবং দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত দুই বছর সময় বাড়িয়ে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে আরও তিন দফায় ৩ বছর ৭ মাস সময় বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ সংশোধন অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ফলে আড়াই বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে ৯ বছর, যা মূল মেয়াদের তুলনায় প্রায় ২৯০ শতাংশ বেশি।

মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়ও। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।

তবে দীর্ঘ বিলম্বের মধ্যেও প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও আর্থিক অগ্রগতি তুলনামূলক কম, যা বর্তমানে ৭৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় গ্যাস টারবাইন ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ করে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি তা ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই সময় ওপেন সাইকেল অপারেশন (আইসিও) সম্পন্ন করে ইউনিটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।

পরবর্তী দুই বছর সাত মাসে ইউনিটটি থেকে প্রায় ৯২ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তবে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১৫ মাস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।

এরপর ২০২১ সালের জুলাই মাসে চলমান অবস্থায় গ্যাস টারবাইনের কম্প্রেসরে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জিই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হলেও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘায়িত হয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৫ সালের জুন মাসে আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল মেরামত ও কমিশনিং কার্যক্রম শুরু করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের অডিট সম্পন্ন হয়েছে। এতে ১৩টি আপত্তি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে একটি নিষ্পত্তি হলেও বাকি আপত্তিগুলো এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

আইএমইডি প্রকল্পটির দুর্বলতার মধ্যে ঋণের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, অগ্রিম অর্থ পরিশোধে জটিলতা, একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ঋণচুক্তি সংশোধনের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা, পুরোনো যন্ত্রপাতির অনির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন কারিগরি চ্যালেঞ্জকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ১৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মিগা থেকে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে শুরু থেকেই বাস্তবায়ন কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া প্রকল্প এলাকা দখলমুক্ত ও হস্তান্তর জটিলতা, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, পিজিসিবির ২৩০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশন নির্মাণে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, দেশি-বিদেশি মামলা, সুইজারল্যান্ডে উদ্ভূত পরিস্থিতি, মেরামত-পরবর্তী প্রস্তুতি এবং যান্ত্রিক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, “কোনো প্রকল্পের মেয়াদ এত বেশি বৃদ্ধি পাওয়া কাম্য নয়। প্রকল্প গ্রহণের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। বাস্তবায়নে কারও গাফিলতি থাকলে তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ইউনি/শাহোরা/


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category