কৈশোরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতা যেন পিছু ছাড়েনি যশোরের মনিরামপুরের তবিবুর রহমানের। মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে ২০১০ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের যশোর জেলার মনিরামপুর পূর্ব থানার নেতৃত্বে আসায় জীবননাশের হুমকিতে পড়েন তিনি। ফলে পুলিশি অভিযানের ভয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও পুলিশ কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাম পায়ের লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারও করাতে হয় তাঁকে।
তবিবুর রহমান জানান, ২০১০ সালে যশোরের মনিরামপুর পূর্ব থানা শাখার সেক্রেটারি থাকাকলীন সময়ে বিরোধী মতের উপড় নিপিড়ন শুরু হয়। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর সরারদেশে চিরুনী অভিযান পরিচালনা তৎকালীন সরকার। তারই অংশ হিসেবে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিকবার তাঁর বাড়ি এবং মাদ্রাসায় যেখানে তিনি ছাত্রাবাসে থাকতেন পুলিশ অভিযান চালায়। ফলে সেসময় থেকে তবিবুরকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকতে হয়। এ সময় পুলিশের অভিযানের মুখে পড়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এতে তাঁর বাম পায়ের লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও সমস্যা থেকে যাওয়ায় ২০১৪ সালে তাঁর অস্ত্রোপচার করতে হয়।
তবিবুর আরও অভিযোগ করে বলেন, মালয়েশিয়া থাকাকালিন, তাঁকে না পেয়ে তাঁর ছোট ভাইকে ১৬-১৭ বছর বয়সে দুটি রাজনৈতিক মামলায় এক মাস কারাগারে রাখা হয়। এছাড়া তৎকালীন স্থানীয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা তবিবুর দেশে ফিরলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি সরকারি তার বাবাকে দিতেন।
তার রাজনৈতিক সহকর্মী মনিরামপুর পূর্ব থানা এবং যশোর জেলা পূর্ব শাখার সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘তবিবুরের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে।
তবিবুর রহমান ২০১০ সালে আত্মগোপনে থাকাকালীন সময়ে আশ্রীতদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানানা, পুলিশের ভয়ে তবিবুর রাতে আমাদের বাড়িতে এসে লুকিয়ে থাকতেন। তাঁকে নিয়ে আমরাও আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতাম। কখন পুলিশ বাড়িতে আসে, সেই ভয়ও কাজ করত।
আওয়ামী লীগের শাসন আমলে বিরোধী মত দমনের ভয়বহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশের গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। এতে বলা জোরপূর্বক গুমের শিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য। গুম তদন্ত কমিশনে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসাবে বিবেচিত হয়। কমিশন জানায়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে ৪৭৬ জন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী। ২৩৬ জন ছাত্রশিবিরের। তবে গুম তদন্ত কমিশনে অভিযোগ না করা ব্যক্তিদের হিসাব ধরলে প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
অন্যদিকে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৫৫ জন নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটির মানবাধিকার বিভাগ। এরমধ্যে সাত নেতাকর্মী এখনো ফেরেনি বলে জানিয়েছে ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবিরের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ বছরে তাদের ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩১২ নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হয়েছিলো। মামলার সংখ্যা ১৮ হাজার ৩৫টি। যার মধ্যে গ্রেফতার হয়েছিলো ৬৬ হাজার ২৪০ জন। এরমধ্যে রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৯ হাজার ৭২২ জন। মোট রিমান্ড ছিলো ২৯ হাজার ৯৭১ দিন। এছাড়া ১৫ বছরে তাদের আহত হয়েছিলো ৩১ হাজার ৭১৫ নেতাকর্মী, পঙ্গু হয়েছেন ৩২৪ জন, আর নিহত হয়েছেন ১০৩ জন। এছাড়াও গুমের শিকার ২৫৫ নেতাকর্মী, যাদের ৭ জন এখনো ফেরেনি।
জানা জায়, এসব কারণে নিরাপত্তার জন্য ২০১২ সালের জুনে দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমালেও স্বস্তি ফেরেনি তাঁর জীবনে। তাঁকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি, ছোট ভাইকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরে ফের হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। দীর্ঘদিনের এই নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন তবিবুর রহমান। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে কয়েকবার বাংলাদেশে ফিরলেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি। এমনকি চিকিৎসা শেষ না করেই জরুরি ভিত্তিতে মালয়েশিয়ায় ফিরে যেতে হয়েছিল বলেও জানান তিনি। মালয়েশিয়ায় থাকাকালীন হামলা বা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকায় বাংলাদেশে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সুযোগ পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে অনলাইনে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয় বলে জানান তিনি।
প্রবাসে থেকেও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তবিবুর। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে জামায়াত-শিবির সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে International Islamic University Malaysia Student Representative Council-এর সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে Co-chairperson of Islamization এর (Vice President) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মালয়েশিয়া শাখা, যা ‘ইসলামি দাওয়াহ সার্কেল মালয়েশিয়া’ (ISDAC) নামে পরিচিত, এর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ ছাড়াও ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়েও দায়িত্ব পালনের কথা জানান তিনি।
২০২১ সালে International Islamic University Malaysia-এর বাংলাদেশ কমিউনিটির নির্বাচনে ৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রথম হন তিনি। বিভিন্ন সময় BDC IIUM-এর Coordinator হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাজ্য শাখার একটি ইউনিটের তারবিয়া সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি। এ ছাড়া নিজ এলাকায় হিউম্যান এইড ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে মনিরামপুরের অসহায় মানুষের সহায়তায় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন তবিবুর। তাঁর নেতৃত্বে করোনাকালেও মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে তিনি একাধিকবার সহযোগিতা করেছেন বলে জানান।
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারকে নিয়ে দেশে থাকার চেষ্টা করেছিলেন তবিবুর। কিন্তু দেশে থাকার প্রতিটি দিনই নতুন করে ভয়ের কারণ হয়ে উঠছিল বলে তাঁর দাবি। প্রায় ১০-১১ বছর মালয়েশিয়ায় থাকার পরও সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের আইনগত সুযোগ না থাকায় এবং বাংলাদেশে নিরাপত্তার ঝুঁকি অব্যাহত থাকায় শেষ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান তিনি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তাঁর আপন নানী, শ্বশুর, খালাসহ বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয় মারা গেলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাঁদের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে বাংলাদেশে যেতে পারেননি তিনি।
দেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও গুপ্ত হামলার শঙ্কা ও সরাসরি প্রাণনাশের হুমকির কারণে শিবির নেতা তবিবুর রহমানের দেশে ফেরা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এই নেতা নিজ পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি যশোর ও মনিরামপুরে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকেও নিজের আশঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের মে ও জুলাইয়ে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও নেতার ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও বাল্যবন্ধু, যশোর জেলা পূর্ব শাখার সাবেক সভাপতি আবু সালেহ উবাইদুল্লাহকে রাতে একা পেয়ে নৃশংসভাবে মারধর করে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তবিবুর। এ ঘটনাও তাঁকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে বলে জানান তিনি।
সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি জীবননাশের হুমকি পান তবিবুর। দেশে ফিরলে তাঁকে মারধর এবং ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। এই হুমকির পর বাংলাদেশে তাঁর ফেরার অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। দেশে ফিরলে তাঁকে আটক, হামলা কিংবা প্রাণনাশের শিকার হতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তবিবুর রহমান।