Dhaka 6:04 pm, Friday, 24 April 2026
শিরোনাম :
বেনাপোল সীমান্তের মাঠ থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য ১৬ বছর ধরে স্কুল ভবনে পুলিশ ফাঁড়ি, সাইক্লোন শেল্টার কাম বিদ্যালয়ে চরম শিক্ষাসংকট কমলগঞ্জের আদমপুর বনবিট;বাড়িতে লাগানো গাছ কেটে ভিলেজারকে মারধর করলেন বনপ্রহরীরা সুন্দরবনে মধু মৌসুম শুরু, বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু ৬টি বন্ধ পাটকল বেসরকারি উদ্যোগে চালু হবে: বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী ২৫ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশের ডাক দিল জামায়াতে ইসলামী জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সংসদে ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব চরমধুয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রই ‘অসুস্থ’: ডাক্তার নেই, অযত্নে পরিত্যক্ত ভবন লুটপাটের কবলে তেল সংকটে কৃষকের আহাজারি, ১৭ বছর পর ধান চাষেও অনিশ্চয়তা ৩৬-৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে পারে: ট্রাম্প

সুন্দরবনে মধু মৌসুম শুরু, বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু


বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে মধু মৌসুম শুরু, বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু
নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কিত মৌয়ালরা, কমছে মধু আহরণ ও অংশগ্রহণ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই জলদস্যু আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মৌয়ালরা। তাদের দাবি, মধু মৌসুমে বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু।

মৌয়ালদের ভাষ্য, বন বিভাগের পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করলেও নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সুন্দরবনই তাদের আয়ের প্রধান উৎস, তাই জীবিকার স্বার্থে বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু জলদস্যুদের উৎপাত দিন দিন বাড়ায় আতঙ্কও বেড়েছে কয়েকগুণ।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহে প্রবেশ শুরু করেছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও শত শত মৌয়াল গহীন বনে ছুটছেন। তবে এবারের মৌসুমে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা।

মৌয়াল মতিউর রহমান বলেন,
“বাঘ, সাপ, কুমির—সব ভয় নিয়েই আমরা কাজ করি। কিন্তু মানুষের ভয়, জলদস্যুর ভয়টাই সবচেয়ে বেশি। বাঘ থাকলে বাঁচার আশা থাকে, কিন্তু দস্যুরা ধরলে মারধর করে, মুক্তিপণ দাবি করে।”

মৌয়াল হাফিজুল ইসলাম বলেন,
“আগে এক-দুইটা বাহিনীকে টাকা দিলে চলতো, এখন চার-পাঁচটা বাহিনী টাকা চায়। এত টাকা দিয়ে লাভ হবে না ক্ষতি হবে—এই চিন্তায় অনেকে যেতে চাচ্ছে না।”

নীলডুমুর এলাকার মৌয়াল শাহাবুদ্দিন গাইন বলেন,
“মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বনে যাই, কিন্তু মধু পাবো তার নিশ্চয়তা নেই। কম মধু পেলে ঋণ শোধ করা যায় না, উল্টো নৌকাও নিয়ে নেওয়া হয়। তার ওপর আবার বিভিন্ন বাহিনীকে টাকা দিতে হয়।”

কমছে মধু আহরণ

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মধু আহরণ ধারাবাহিকভাবে কমছে।

২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ হলেও ২০২২ সালে তা কমে ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে নেমে আসে। ২০২৩ সালে আহরণ হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল এবং ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।

এ প্রবণতার প্রভাব পড়েছে মৌয়ালদের সংখ্যাতেও। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে যুক্ত ছিলেন, ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৫ হাজারে নেমে আসে।

সরকারের আশ্বাস

মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন,
“আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অভিযান শুরু হয়েছে। কিছু দস্যু আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে পেরেছি। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও বলেন,
“বর্তমান সরকার কখনও দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও প্রত্যাশা পূরণে আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছি।”

উপকূলীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলদস্যু আতঙ্ক দূর না হলে মধু আহরণে মৌয়ালদের অংশগ্রহণ আরও কমে যেতে পারে। এতে উপকূলীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

মৌয়ালদের একটাই দাবি—দ্রুত সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে তারা নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

News Admin

জনপ্রিয় নিউজ

বেনাপোল সীমান্তের মাঠ থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

সুন্দরবনে মধু মৌসুম শুরু, বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু

Update Time : 02:40:47 pm, Thursday, 23 April 2026

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে মধু মৌসুম শুরু, বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু
নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কিত মৌয়ালরা, কমছে মধু আহরণ ও অংশগ্রহণ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই জলদস্যু আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মৌয়ালরা। তাদের দাবি, মধু মৌসুমে বাঘের চেয়েও বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু।

মৌয়ালদের ভাষ্য, বন বিভাগের পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করলেও নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সুন্দরবনই তাদের আয়ের প্রধান উৎস, তাই জীবিকার স্বার্থে বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু জলদস্যুদের উৎপাত দিন দিন বাড়ায় আতঙ্কও বেড়েছে কয়েকগুণ।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহে প্রবেশ শুরু করেছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও শত শত মৌয়াল গহীন বনে ছুটছেন। তবে এবারের মৌসুমে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা।

মৌয়াল মতিউর রহমান বলেন,
“বাঘ, সাপ, কুমির—সব ভয় নিয়েই আমরা কাজ করি। কিন্তু মানুষের ভয়, জলদস্যুর ভয়টাই সবচেয়ে বেশি। বাঘ থাকলে বাঁচার আশা থাকে, কিন্তু দস্যুরা ধরলে মারধর করে, মুক্তিপণ দাবি করে।”

মৌয়াল হাফিজুল ইসলাম বলেন,
“আগে এক-দুইটা বাহিনীকে টাকা দিলে চলতো, এখন চার-পাঁচটা বাহিনী টাকা চায়। এত টাকা দিয়ে লাভ হবে না ক্ষতি হবে—এই চিন্তায় অনেকে যেতে চাচ্ছে না।”

নীলডুমুর এলাকার মৌয়াল শাহাবুদ্দিন গাইন বলেন,
“মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বনে যাই, কিন্তু মধু পাবো তার নিশ্চয়তা নেই। কম মধু পেলে ঋণ শোধ করা যায় না, উল্টো নৌকাও নিয়ে নেওয়া হয়। তার ওপর আবার বিভিন্ন বাহিনীকে টাকা দিতে হয়।”

কমছে মধু আহরণ

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মধু আহরণ ধারাবাহিকভাবে কমছে।

২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ হলেও ২০২২ সালে তা কমে ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে নেমে আসে। ২০২৩ সালে আহরণ হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল এবং ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।

এ প্রবণতার প্রভাব পড়েছে মৌয়ালদের সংখ্যাতেও। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে যুক্ত ছিলেন, ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৫ হাজারে নেমে আসে।

সরকারের আশ্বাস

মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন,
“আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অভিযান শুরু হয়েছে। কিছু দস্যু আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে পেরেছি। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও বলেন,
“বর্তমান সরকার কখনও দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও প্রত্যাশা পূরণে আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছি।”

উপকূলীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলদস্যু আতঙ্ক দূর না হলে মধু আহরণে মৌয়ালদের অংশগ্রহণ আরও কমে যেতে পারে। এতে উপকূলীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

মৌয়ালদের একটাই দাবি—দ্রুত সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে তারা নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।