এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা থেকে ::
স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে লড়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে সুন্দরবন সাব-সেক্টরের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন। সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শামসুল আলম তালুকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনকেও তুচ্ছ করেছিলেন। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম লাল (৮৫) যেন আজ নিজেই এক পরাজিত সৈনিক। সন্তানহীন এই মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর অসুস্থ স্ত্রী চরম অর্থকষ্ট, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলবর্তী জনপদ বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও নানা জটিল রোগে আক্রান্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম লাল প্রায় শয্যাশায়ী। অর্থাভাবে পুষ্টিকর খাবার কিংবা উন্নত চিকিৎসা তাঁর নাগালের বাইরে। একইভাবে তাঁর সহধর্মিণী বেগম আনিসা পারভীন রেবাও দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। সন্তান না থাকায় শেষ বয়সে এসে তাদের দেখাশোনা করার মতো কোনো নিকটজনও নেই।
কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস আর চোখে জমে থাকা অভিমান নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম, কিন্তু আজ কেউ খোঁজ নেয় না। বেঁচে আছি নাকি না খেয়ে আছি, সে খবরও কেউ রাখে না।”
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের পাশাপাশি নজরুল ইসলাম লাল শরণখোলা উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি ছিলেন। তাঁর স্ত্রী বেগম আনিসা পারভীন রেবা ছিলেন উপজেলা মহিলা দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গীরাও যেন আজ দূরে সরে গেছেন। আক্ষেপ করে তিনি জানান, নিজের দলের অনেক নেতা-কর্মীও আর তাঁর খোঁজখবর নেন না। তবে সম্প্রতি বিএনপির কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম তাঁর খোঁজ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, সরকার থেকে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ স্বামী-স্ত্রীর ওষুধ ও চিকিৎসার পেছনেই প্রায় শেষ হয়ে যায়। দুজনের সেবাযত্নের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে একজন গৃহকর্মী রাখতে হয়েছে। কিন্তু এই ব্যয়ভার বহন করাও তাঁর জন্য এখন বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের দেওয়া ‘বীর নিবাস’ প্রকল্প থেকেও বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, শরণখোলার অনেক মুক্তিযোদ্ধা সরকারি ভবন পেলেও বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাঁর ভাগ্যে সেই ঘর জোটেনি। দীর্ঘদিন ভাঙাচোরা টিনের ঘরে অমানবিক কষ্টে বসবাস করার পর কয়েক মাস আগে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে নতুন টিন দিয়ে ঘরের চাল মেরামত করেছেন, যাতে অন্তত বর্ষার পানি ঘরের ভেতরে না পড়ে।
জীবনের শেষ সময়ে এসে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার একটাই আকুতি— তাঁর মতো আর কোনো সূর্যসন্তান যেন অবহেলা, অযত্ন ও অসহায়ত্বের মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাতে বাধ্য না হন। স্বাধীনতার জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।
এ বিষয়ে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অর্পিতা হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য সরকারিভাবে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।”
স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা একজন সম্মুখযোদ্ধার শেষ বয়সের এই করুণ বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি জাতির বিবেকের কাছে এক গভীর প্রশ্ন। যে সূর্যসন্তানদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ, তাঁদের শেষ জীবন কি এমন অবহেলা আর অসহায়ত্বের মধ্যেই কাটবে?