নিজস্ব প্রতিবেদক
স্থবিরতা আর ভীতি কাটিয়ে এবার এক ভিন্ন আবহে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অস্থিতিশীলতা ও ‘মব সন্ত্রাসের’ ছায়া মাড়িয়ে ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনমনে স্বস্তি ফেরায় এবার উৎসবমুখর পরিবেশে দেশজুড়ে পালিত হবে দিনটি।
২০২৫ সালের প্রেক্ষাপট ছিল এর ঠিক উল্টো। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজধানীর ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ভাঙচুর, মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় তৈরি হয়েছিল চরম নিরাপত্তাহীনতা।
এমনকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের প্রথাগত আয়োজনগুলোও মব সন্ত্রাসের ভয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, গত বছরের সেই ভীতি কাটিয়ে এবার প্রাণের উৎসবে ফিরছে দেশ।
ছায়ানট সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ‘বিগত বছরের অস্থিরতা আমাদের শঙ্কিত করেছিল, কিন্তু নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে যে স্বস্তি ফিরেছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবারের আয়োজনে।’
রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা ও কুচকাওয়াজ
আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনৈতিক কোরের সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।
সাভারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সকাল ৯টায় ঢাকার জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে শুরু হবে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এবারের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অভিবাদন গ্রহণ করবেন।
বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা আজ বিকেলে বঙ্গভবনে ৫৬তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিকেলে বঙ্গভবনের সবুজ লনে আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের সদস্য ও বিশিষ্ট নাগরিকরা অংশ নেবেন।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কেক কাটবেন। তারা আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং হালকা আপ্যায়নেরও আয়োজন থাকবে।
স্মারক ডাকটিকিট উদ্বোধন
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ১০ টাকা মূল্যমানের একটি উদ্বোধনী খাম, ৫ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটাকার্ড এবং একটি বিশেষ সিলমোহর উদ্বোধন করেন।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ দপ্তরে তিনি এসবের উদ্বোধন করেন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশেষ কনসার্ট
আইএসপিআর আরও জানিয়েছে, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দলের পাশাপাশি সেখানে পারফর্ম করবে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’। বর্ণিল এই আয়োজনটিও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
১৪তম বছরে ‘শোক থেকে শক্তি: অদম্য পদযাত্রা’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পর্বতারোহীদের সংগঠন ‘অভিযাত্রী’র যৌথ আয়োজনে এবার ১৪তম বছরে পদার্পণ করছে ‘শোক থেকে শক্তি: অদম্য পদযাত্রা’। আজ সকাল ৬টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে এই পদযাত্রার সূচনা হবে। পদযাত্রী দলটি শহিদ মিনার থেকে যাত্রা শুরু করে জগন্নাথ হল বধ্যভূমি, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, সায়েন্স ল্যাব ও পিলখানা হয়ে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ অভিমুখে এগিয়ে যাবে, যা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও আল-বদরদের নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর অভিযাত্রীরা আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সেখান থেকে তুরাগ নদ পার হয়ে সাভারের সাদুল্লাপুর, কলমা গ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে সন্ধ্যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শপথ পাঠের মাধ্যমে পদযাত্রা সমাপ্ত হবে। ২০১৩ সালে স্বাধীনতার ৪২ বছর পূর্তিতে ৪২ কিলোমিটার হেঁটে এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল। ঢাকার পাশাপাশি এবার মৌলভীবাজারেও এই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৩০ বছর ও শিশু-কিশোর উৎসব
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গত ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্ণ করেছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সকাল ১০টায় জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলন এবং মিলনায়তনে শিশু-কিশোরদের জন্য আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির দিনব্যাপী কর্মসূচি
২০২৫ সালে স্বাধীনতা দিবসে ‘মুক্তির মহিমা’ শিরোনামে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমি। ঢিলেঢালা সেই আয়োজন নিয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনে বিস্তর সমালোচনা হয়েছিল। এবার শিল্পকলা একাডেমি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। আজ সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মুখ্য আলোচক হিসেবে থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল আলম। সাংস্কৃতিক পর্বে খুরশিদ আলম, আলম আরা মিনু, মনির খান, ফেরদৌস আরার মতো বরেণ্য শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করবেন। এ ছাড়া ‘দ্য পিপলস প্রেসিডেন্ট’ শীর্ষক একটি ৩০ মিনিটের তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে।
সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ছায়ানটের আয়োজন
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে আজ বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আলোচনা, গান, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে। এতে উপস্থিত থাকবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খালেকুজ্জামান ও শামসুজ্জামান মিলন। অন্যদিকে ছায়ানট মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অনুষ্ঠিত হবে গান, আবৃত্তি ও কথনসংবলিত বিশেষ অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে আজ বিকেল ৪টায় শিক্ষা চত্বর থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত ‘জাতীয় পতাকা মিছিল’ অনুষ্ঠিত হবে।
ইউনি/শাহোরা /
Reporter Name 



















