Dhaka 1:44 am, Wednesday, 1 April 2026
শিরোনাম :
প্রধানমন্ত্রীর ‘ক্রীড়া কার্ড’ পেয়ে আবেগাপ্লুত খেলোয়াড়রা সিঙ্গাপুরের কাছে হেরে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ স্কুল চলাকালীন যানজট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীকে বিকল্প খুঁজতে বললেন প্রধানমন্ত্রী শ্রবণশক্তি হারিয়ে গান থেকে অনেকটা দূরে সরে এলের অলকা নরসিংদী জেলা বিএনপির সহ সভাপতি তোফাজ্জল হোসেনকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ বাড়ছে না জ্বালানি তেলের দাম আজ জানা যাবে জ্বালানী তেলের নতুন দাম বর্জ্যমুক্ত ঢাকা গড়তে নাগরিক ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই: ডিএসসিসি প্রশাসক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর সাথে এডিবি কান্ট্রি ডিরেক্টর এর সাক্ষাৎ গ্রিক উপকূলে ২২ অভিবাসীর মৃত্যূ, নিহতদের ১৮ জনই বাংলাদেশি

রায়পুরার শান্ত চরমধুয়া এখন অশান্তির জনপদ: নেপথ্যে কারা?

নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল চরমধুয়া, যা একসময় পরিচিত ছিল শান্ত জনপদ হিসেবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। বর্তমানে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের এক বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত হয়েছে এই ইউনিয়ন। চরম আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩০টি পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম হত্যার ঘটনাকে পুঁজি করে এক নজিরবিহীন তাণ্ডব শুরু হয়। জসিম উদ্দিনের ছোট ভাই কামরুল এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামি আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। এ যেন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় অপরাধের মহোৎসব।
কামরুল নিজেকে থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয় দিলেও রায়পুরা থানা যুবদলের আহ্বায়ক আলফাজ উদ্দিন মিঠু জানিয়েছেন, দলীয় কমিটিতে কামরুলের কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেটটি এখন চরমধুয়ার নিয়ন্ত্রক।

হামলার শিকার আসমা বেগম জানান, “আমানুল্লাহর নেতৃত্বে হঠাৎ একদল যুবক আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। ঘরের সবকিছু ভেঙে চুরমার করেছে, আমার মাকে মারধর করেছে। ঘর থেকে ৭০ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা এখন কোথায় যাব?”

আরেক ভুক্তভোগী সুরাইয়া বেগম বলেন, “আমাদের ৪টি গরু এবং নারীদের স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে ওরা। এরপর ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা শুধু বিচার চাই এবং নিজের ভিটায় শান্তিতে ফিরতে চাই।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, এই তাণ্ডবের সময় এক গৃহবধূ ও এক তরুণী শীলতাহানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু আসামিদের দাপটে তারা থানায় মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আমানুল্লাহ বাহিনীর হাতে জিম্মি পুরো এলাকা হলেও প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব। জসিম উদ্দিন ও তার ভাই কামরুলই এই সন্ত্রাসী বাহিনীর অর্থের যোগানদাতা বলে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে জসিম উদ্দিন বলেন, “চরমধুয়া দুটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। একটির নেতৃত্বে ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার এবং অন্যটি আমান উল্লাহ। আমার নিজের গ্রামের বাইরে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।”

এদিকে অভিযুক্ত আমান উল্লাহ উদ্ধত কণ্ঠে বলেন, “আপনারা নিউজ করে যা করার করেন, আমার কিছু বলার নেই।”

ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার বলেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে সবার ভালো-মন্দ দেখতে হয়। এ কারণে কোনো পক্ষ আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অপপ্রচার চালাতে পারে।”

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি আরও বলেন, “চরাঞ্চলে কোনো ঘটনা ঘটলে পক্ষ বিপক্ষ তৈরি হওয়াটা সাধারণ চিত্র, তবে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানান, রফিকুল হত্যা মামলার দুজন আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চরমধুয়ার সাধারণ মানুষের দাবি, এই সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায় তা খুঁজে বের করা হোক। অবিলম্বে জসিম উদ্দিন ও আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এই জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।

ইউনি/শাহোরা/

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

News Admin

জনপ্রিয় নিউজ

প্রধানমন্ত্রীর ‘ক্রীড়া কার্ড’ পেয়ে আবেগাপ্লুত খেলোয়াড়রা

রায়পুরার শান্ত চরমধুয়া এখন অশান্তির জনপদ: নেপথ্যে কারা?

Update Time : 04:26:40 pm, Saturday, 28 March 2026

নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল চরমধুয়া, যা একসময় পরিচিত ছিল শান্ত জনপদ হিসেবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। বর্তমানে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের এক বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত হয়েছে এই ইউনিয়ন। চরম আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩০টি পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম হত্যার ঘটনাকে পুঁজি করে এক নজিরবিহীন তাণ্ডব শুরু হয়। জসিম উদ্দিনের ছোট ভাই কামরুল এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামি আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। এ যেন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় অপরাধের মহোৎসব।
কামরুল নিজেকে থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয় দিলেও রায়পুরা থানা যুবদলের আহ্বায়ক আলফাজ উদ্দিন মিঠু জানিয়েছেন, দলীয় কমিটিতে কামরুলের কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেটটি এখন চরমধুয়ার নিয়ন্ত্রক।

হামলার শিকার আসমা বেগম জানান, “আমানুল্লাহর নেতৃত্বে হঠাৎ একদল যুবক আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। ঘরের সবকিছু ভেঙে চুরমার করেছে, আমার মাকে মারধর করেছে। ঘর থেকে ৭০ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা এখন কোথায় যাব?”

আরেক ভুক্তভোগী সুরাইয়া বেগম বলেন, “আমাদের ৪টি গরু এবং নারীদের স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে ওরা। এরপর ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা শুধু বিচার চাই এবং নিজের ভিটায় শান্তিতে ফিরতে চাই।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, এই তাণ্ডবের সময় এক গৃহবধূ ও এক তরুণী শীলতাহানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু আসামিদের দাপটে তারা থানায় মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আমানুল্লাহ বাহিনীর হাতে জিম্মি পুরো এলাকা হলেও প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব। জসিম উদ্দিন ও তার ভাই কামরুলই এই সন্ত্রাসী বাহিনীর অর্থের যোগানদাতা বলে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে জসিম উদ্দিন বলেন, “চরমধুয়া দুটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। একটির নেতৃত্বে ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার এবং অন্যটি আমান উল্লাহ। আমার নিজের গ্রামের বাইরে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।”

এদিকে অভিযুক্ত আমান উল্লাহ উদ্ধত কণ্ঠে বলেন, “আপনারা নিউজ করে যা করার করেন, আমার কিছু বলার নেই।”

ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার বলেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে সবার ভালো-মন্দ দেখতে হয়। এ কারণে কোনো পক্ষ আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অপপ্রচার চালাতে পারে।”

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি আরও বলেন, “চরাঞ্চলে কোনো ঘটনা ঘটলে পক্ষ বিপক্ষ তৈরি হওয়াটা সাধারণ চিত্র, তবে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানান, রফিকুল হত্যা মামলার দুজন আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চরমধুয়ার সাধারণ মানুষের দাবি, এই সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায় তা খুঁজে বের করা হোক। অবিলম্বে জসিম উদ্দিন ও আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এই জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।

ইউনি/শাহোরা/