• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
জুভেন্টাসের নজরে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, জোর গুঞ্জন ইতালিতে রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স আজ হাইকোর্টে পাঠানো হচ্ছে টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে মোসাদ্দেক পাল্টাপাল্টি হামলা থামানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও ইসরায়েলের টাঙ্গাইলে ট্রাকের পেছনে পিকআপের ধাক্কা, নিহত ৪ চিরকুটে লিখে নবম শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যা নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশনে ছুরি হামলায় আহত ৫, সন্দেহভাজন আটক প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিবে ২২ লাখ ক্ষুদে শিক্ষার্থী ভারত থেকে ফিরলেন ৯১ বাংলাদেশি জেলে; মোংলায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর নরসিংদীর জিআই পণ্য লটকন; প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন ও দাম সংকটে চাষিরা

নরসিংদীর জিআই পণ্য লটকন; প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন ও দাম সংকটে চাষিরা

মো. শাহাদাৎ হোসেন রাজু / ৩৭ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক 
দেশীয় ফল লটকন স্থানীয়ভাবে ‘বুগি’ নামে পরিচিত ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ। অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ঔষধিগুণে ভরপুর এ ফলকে এক সময় জংলি ফল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বন-বাদাড় ও ঝোপঝাড়ে জন্মানো গাছে স্বাভাবিকভাবেই ফল ধরত। তখন এর তেমন কদর ছিল না। তবে সময়ের পরিক্রমায় লটকনের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলটির জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বহুগুণে বেড়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘বুগি’ নামে পরিচিত এ ফলটি নরসিংদী জেলার জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। গাছের কাণ্ডজুড়ে থরে থরে ঝুলে থাকা লটকনের দৃশ্য সহজেই যে কারও নজর কাড়ে। বর্ষার স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে এ সৌন্দর্য আরও বেশি ফুটে ওঠে। একসময় অপ্রচলিত হিসেবে পরিচিত এ ফল বর্তমানে একটি জনপ্রিয় অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
প্রায় ১২০ বছর আগে শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামের মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ এ অঞ্চলে লটকন চাষের সূচনা করেন। লটকন চাষে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একাধিকবার চ্যানেল আই কৃষি পুরস্কার লাভ করেন। তার অনুপ্রেরণায় শিবপুর ও বেলাব উপজেলার লাল মাটিবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকায় লটকন চাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি লটকনের পুষ্টিগুণ ও বাজার চাহিদা বাড়ায় প্রতিবছরই এর আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে শিবপুর ও বেলাব উপজেলার হাজারো পরিবারের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে লটকন। অনেক বেকার যুবকও লটকন চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
তবে চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন লটকন চাষিরা। মৌসুমের শুরুতে গাছে প্রচুর গুটি এলেও সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী খরা, পরবর্তীতে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে অনেক গুটি ঝরে পড়ায় প্রত্যাশিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
চাষিদের অভিযোগ, ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। চলতি মৌসুমের শুরুতে অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রতি কেজি লটকন ৩০ থেকে ৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকরা যে দামে ফসল বিক্রির আশা করেছিলেন, সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান থাকায় সেখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে সাড়ে ১৭ টন হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ মেট্রিক টন (এক টন সমান ১০১৬ কেজি) লটকন উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। উৎপাদিত লটকন পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হলে এর  বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
শিবপুর উপজেলার কামারটেক এলাকার লটকন চাষি রুবেল মিয়া বলেন, “মৌসুমের শুরুতে গাছে প্রচুর গুটি ধরেছিল। এতে ভালো ফলনের আশা জেগেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পরে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে অনেক গুটি ঝরে পড়ে। এতে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।”
শিবপুর উপজেলার ছোটবন গ্রামের লটকন চাষি মামুন বলেন, “গাছে গুটি বেশি থাকায় ভালো ফলন ও ভালো দামের আশা করেছিলাম। কিন্তু আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় সেই আশা অনেকটাই ভেঙে গেছে। লোকসান না হলেও প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
মাসুদ মোল্লা নামে অপর এক লটকন চাষি বলেন, তিনি নিজেই তার বাগানের লটকন বাজারে নিয়ে পাইকারি বিক্রি করেন। এতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। চলতি বছর তার তিন বিঘা জমির লটকন বিক্রি করে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় হওয়ার আশা করছেন। তিনি জানান, লটকন চাষে তুলনামূলক কম পরিচর্যা প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, লটকনের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘বল্লা’ পোকার আক্রমণ। এ পোকা ফলের গুটিতে ছিদ্র করে, ফলে আক্রান্ত গুটি ঝরে পড়ে। সাধারণত গাছে কীটনাশকযুক্ত ফাঁদ স্থাপনের মাধ্যমে এ পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
লটকনের পাইকারি ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতিবছর মৌসুম শুরুর আগেই বাগান কিনে থাকেন। এ বছর তিনি লটকনের ১৫টি বাগান কিনেছেন, যার জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব বাগান থেকে উৎপাদিত লটকন বিক্রি করে অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় হবে বলে তিনি আশা করছেন।
চাষিরা বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশা, মৌসুমের বাকি সময়ে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হলে ক্ষতির একটি অংশ হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন,“মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে লটকন চাষিরা কিছুটা খরার মুখে পড়লেও সামগ্রিকভাবে গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লটকন চাষকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করতে এবং রোগবালাই সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লটকনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। এ কারণে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category