দ্রুত বিচার শেষ করতে পারলে ভালো। তবে ধর্ষণ মামলার বিচার তড়িঘড়ি করে শেষ করার চেয়ে সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আইনবিশেষজ্ঞ এবং অধিকারকর্মীরা। একই সঙ্গে এই মামলাগুলোর বিচার দ্রুত করতে গেলে ন্যায়বিচার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মত দেন তারা।
আজ মঙ্গলবার( ৯জুন ) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ধর্ষণ ও নির্যাতন: আইনগত সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’–এর ব্যানারে সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
সভায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, বিচার তাড়াতাড়ি করতে পারলে ভালো অবশ্যই। তবে সঠিক তদন্তকে বাদ দিয়ে নয়।
১৯৮৯ সালের শারমিন রিমা হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তাড়াতাড়ি সাজা হয়েছে। তাড়াতাড়ি অলমোস্ট ফাঁসিও হয়ে গেছে।…এই কেস ফাঁসির কেস ছিল না…এটা যাবজ্জীবনের কেস ছিল। এই কেসে ফাঁসি হয়েছে এই কারণে যে রিমার বাবা একজন সাংবাদিক ছিলেন।’
বিচারপতি ইমান আলী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থাও বাধাপ্রাপ্ত হয়। কারণ, অভিযুক্তরা অর্থ, সামাজিক মর্যাদা বা রাজনৈতিক সংযোগে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে থাকেন। ফলে তদন্তই শেষ হয় না। ভুক্তভোগী এফআইআরই করতে পারেন না।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জিনাত আরা সতর্ক করেন যে বিচারের সময়সীমা বাধ্যতামূলক করার তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে।
তিনি বলেন, একসময় মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক মামলা শেষ করা সম্ভব হয়নি। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আবেদনও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো করা হয়নি। ফলে হত্যা ও জোড়া হত্যাসহ শত শত গুরুতর মামলায় আসামিরা আইনি সুবিধা পেয়ে মুক্তি পেয়ে যান।
জিনাত আরা মনে করেন, বিচারের সব পর্যায়েই সমস্যার মূলে রয়েছে নৈতিকতার অভাব। তিনি বলেন, সব জায়গায় যদি প্রত্যেকে সততার সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে সবকিছু্ই সময়মতো করা সম্ভব।
আতঙ্ক প্রকাশ করছি, সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশুহত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক। তিনি বলেন, ‘এভাবে যে ১৯ দিনের মাথায় সব শেষ করে ফেলা হলো; এটাতে অনেকে আনন্দিত হয়েছেন, আনন্দ প্রকাশ করেছেন, স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আমি স্বস্তিও প্রকাশ করতে পারছি না, আনন্দ তো নয়ই, বরঞ্চ আমি আতঙ্ক প্রকাশ করছি যে আমাদের ভবিষ্যতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে এটা কোনো দিকনির্দেশনা দেয়।’অন্যায় বিচার যেন না হয়।
সভায় উপস্থাপনা দেন ব্লাস্টের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট ইসরাত জাহান। এতে আলোচক হিসেবে আরও ছিলেন ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, কাজী জাহেদ ইকবাল, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম প্রমুখ। সভাটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন।