কারও নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একসময় যারা একটি ব্যাংক দখলে নিয়েছিল, সেই ব্যাংক হাতছাড়া হওয়ার কষ্ট তারা এখন অনুভব করছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধে’ আনা একটি নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আওতায় নোটিশটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন বলা হচ্ছে সরকার ব্যাংকের মালিক নয়, জামায়াতে ইসলামও ব্যাংকের মালিক নয়; আবার একই সঙ্গে ইসলামের ওপর হাত না দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক মানেই ইসলাম নয়। জনাব ফখরুল ইসলাম ইসলাম নন, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যাংক একসময় আজান ও তকবিরের মাধ্যমে দখল করা হয়েছিল, সেই দখল হারানোর যন্ত্রণা কী হতে পারে, সেটা আমরা বুঝি মাননীয় স্পিকার।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে নানা ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। তিনি জানান, ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প আরডিএসের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হলেও ৫ আগস্টের পর নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট মালামাল বিক্রি হলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, অনেকে দাবি করেন সেই অর্থ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে ব্যবহৃত হয়েছে।
নাবিল গ্রুপের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক দায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এ বিষয়ে কেন তদন্ত হয়নি, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের আগে একটি গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির নামে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিমানের টিকিটের খরচও ব্যাংক বহন করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব বিষয়ও তদন্ত করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যাংক দখলের পর নিয়মনীতি অনুসরণ না করে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। একই সময়ে নতুন করে ৬ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁরা একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া ১৩ হাজার জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে অনেককে যোগ্যতার নির্ধারিত ধাপ অতিক্রম করে একাধিক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই অনিয়মগুলো ঘটেছে। অনেকের ধারণা, ইসলামের নাম ব্যবহার করেই এসব করা হয়েছে। তদন্ত হলে হয়তো আমাদের পরিচিত কারও নামও সামনে আসতে পারে।’
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারধারীদের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেয়ার কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, সেটি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত বা মামলার বিষয় হতে পারে। তবে যাঁরা শেয়ারধারী, তাঁরা শেয়ারধারী হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ডাকাতির মাধ্যমে নেওয়ার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ইবনে সিনার ২ শতাংশ শেয়ার ছিল, যা ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমান শেয়ার মালিকানার হিসাবে প্রায় ৮১ শতাংশ শেয়ার একটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বৈধ ও প্রকৃত শেয়ারধারীদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, তা প্রকাশের দাবি জানান।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের সব ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে এসব তদন্ত পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের অর্থ যারা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো তদন্তও চলছে না। তবে নতুন কোনো অভিযোগ এলে তা তদন্তের আওতায় আনা হবে।